.jpg)
সবুজবাগের বাড়িতে মৌলভী সৈয়দ গড়ে তুলেছিলেন বিশাল গেরিলাদল
রিটন আহসান
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আগ্রাবাদ পানওয়ালাপাড়ার সবুজবাগের মরহুম আবদুল হাই সর্দারের বাড়িটি ছিল তৎকালীণ শহর ছাত্রলীগ সভাপতি মৌলভী সৈয়দ আহমদের প্রধান দফতর। বাড়িটি শহরের মধ্যে হলেও তখনো সেখানে অনেকাংশে গ্রামীণ অবয়ব ছিল। যে কারণে তিনি অন্যসব স্থানের চেয়ে এই স্থানেেক অধিকতর নিরাপদ আস্তানা হিসেবে নিয়েছিল। আবদুল হাই সরদারের পুত্র মুক্তিযোদ্ধা আবু সাইদ সরদার জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশপ্রেমী অসংখ্য যুবককে নিয়ে সবুজবাগের এই বাড়িতে মৌলভী সৈয়দ গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল গেরিলাদল। অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য শ্রমিক যুবক এই দলে যোগ দিতে থাকে। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয় আগ্রাবাদ ছোটপোল নুর মোহাম্মদ প্রকাশ মিষ্টি চাচার বাড়ি এবং পার্শ্ববর্তী মাঠটিকে। আগ্রাবাদ রঙ্গিপাড়া নাপিতের বাড়ির মাটির ঘরে স্থাপন করা হয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান গোপন দফতর। মৌলভী সৈয়দের প্রধান ঘাঁটি সবুজবাগের চতুর্দিকে অসংখ্য অলিগলি থাকায় যা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য শাপে বর হলেও শত্রুপক্ষের জন্য ছিল জটিল একটি বিষয়।
মৌলভী সৈয়দের নেতৃত্বে আনন্দীপুরের মোহাম্মদ হারিস, রামপুরার আবদুল মোনাফ, দামপাড়ার আবদুর রউফ, পানওয়ালাপাড়ার মীর সুলতান আহমদ, সলিমুল্লাহ এবং আবু সাইদ সরদার ১৯৭১ সালের ৭ মে রামপুরার আবদুল মোনাফের কাচারি ঘরে কোরান শরিফ হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের শপথ নেন । পর্যায়ক্রমে তাদের সাথে সাংগঠনিক তৎপরতার সাথে যুক্ত হন হাজপাড়ার জালাল উদ্দিন আহমদ, মঈনউদ্দিন খান বাদল বর্তমানে এমপি, নুরুল ইসলামসহ আরো অনেকে।
ভারত থেকে আগত মুক্তিযোদ্ধাদের আনা ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগৃহীত অস্ত্রগুলো রাখা হতো পানওয়ালাপাড়া, রঙ্গীপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, ছোটপোলসহ আশপাশের বাড়ির কবরস্থানে । কবরস্থানে কৌশলে এমনভাবে কবর বানানো হতো যে, হঠাৎ করে যে কারো কাছে সদ্য খোঁড়া কোন কবর মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ছিল। এসব কবরে বড় ছোট নানা আকারের ড্রাম ভর্তি করে রাখা হতো অসংখ্য অস্ত্র। রাতের বেলা কবর থেকে অস্ত্র তুলে বিভিন্ন অভিযানে তা ব্যবহার করা হতো এবং কাজ শেষে আবারো মাটি চাপা দেয়া হতো।
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যে সব অস্ত্র ছিল তার মধ্যে ছিল এসএমজি, এলএমজি, স্টেনগান, গ্রেনেড, স্মোক বোমা, লিমপেড মাইন, অ্যাক্সপ্লোসিভসহ নানারকমের বন্দুক ।
বিভিন্ন সময়ে যারা এই বাড়িতে যারা এসেছিলেন তারা হলেন, ডা. মাহফুজুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন, ডা. শাহ আলম বীরউত্তম, মাজহারুল্লাহ বীরউত্তম, নৌ কমান্ডো ফারুক-ই-আজম, কাজী ইনামুল হক দানু, সৈয়দ মোহাম্মদ এমরান, আবদুল্লাহ আল হারুন, ডা. জাফর উল্লাহ, ডা. মুলকুতুর রহমান, অমল মিত্র, মুকুল দাশ, অরুন দাশগুপ্ত, রবিউল হোসেন কচিসহ আরো অনেকে ।
জানা যায়, সবুজবাগের বাড়িটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কথা জানতে পেরে পাকবাহিনী অন্তত তিনবার গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে বিধ্বস্ত করে । এ কাজে প্রধান ইন্ধনদাতা ছিল তৎকালীন আলবদর বাহিনীর জল্লাদ জাফরুল্লা এবং খোকা।। অবশ্য, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তাদের মৃত্যু হয়
সেদিনের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মৌলভী সৈয়দ আর বেঁচে নেই, নেই তার অনেক সহযোদ্ধাও । কিন্তু সেদিনের স্মৃতিবাহী পানওয়ালাপাড়ার সেই বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হিসেবে। ইতোমধ্যে বাড়ির মালিকানা বদল হয়েছে।
কিন্তু এখনো মূল্যায়ন হয়নি অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার । তাদের অনেককেই দিন কাটাতে হচ্ছে খেয়ে না খেয়ে। কিন্তু তাদের সাথে সেদিন যারা বিরোধিতা করেছিলো তাদের অনেকেই এখন রয়েছেন বহাল তবিয়তে। যা অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবায় প্রতিনিয়ত।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম যোদ্ধা মোহাম্মদ সিকান্দার আলী বলেন, আমাদের চাওয়া পাওয়ার অনেককিছুই ছিল, এতবছরেও যখন পাইনি তখন তা নিয়তি বলে ধরে নিলাম । মনকে সান্ত¡না দিলাম এই ভেবে যে, কিছু পাইনি তাতে কি দেশতো স্বাধীন করতে পেরেছি। কজনের ভাগ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ আসে। কিন্তু দুঃখটা বাড়ে তখনই, যখন অমুক্তিযোদ্ধাদের রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হতে দেখি। যখন তাদের গাড়িতেই আমাদের রক্তে অর্জিত পতাকা উড়তে দেখি তখন মনে হয় আবার গর্জে উঠি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন