চট্টগ্রামে চার কারণে থমকে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
মিঠুন চৌধুরী
‘গ্রীষ্মকাল শুরু হতে না হতেই বেড়ে গেছে লোডশেডিং । প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর বিদ্যুৎ চলে যায়।। তার উপর আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ সুপ্রভাত বাংলাদেশের কাছে এভাবেই ভোগান্তির কথা বলেন আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা সাইদুল হক। নগরীর সব এলাকার চিত্র একই। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ( পিডিবি) তেমন কোনো আশার বাণী শোনাতে পারে নি। দৈনিক ৬৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি পাঁচটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মোট উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ অবস্থা চলে মধ্যরাত পর্যন্ত
সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপে জানা যায়, গ্যাস সংকট, মেরামতের জন্য ইউনিট বন্ধ থাকা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শেষ না হওয়া এবং কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা কমে যাওয়া এই চার কারণে কাঙিক্ষত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না । সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামের সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ৬৩৭ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২৮০ মেগাওয়াট। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহও কমে গেছে। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হতো দৈনিক গড়ে ২০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮০ মেগাওয়াট। তাই প্রতিদিন লোডশেডিং করা হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (উৎপাদন) মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না । গ্যাস সরবরাহ এবং কাপ্তাই এ নতুন ইউনিট চালু সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমরা আমাদের চাহিদার কথা বহুবার জানিয়েছি।
পিডিবি সূত্র আরো জানায়, গ্রীষ্ম মৌসুমে বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না থাকায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে সারা দেশেই লোড ম্যানেজমেন্ট করা হচ্ছে । লোড ম্যানেজমেন্ট এর নীতি হলো, উৎপাদন এবং চাহিদা অনুসারে সরবরাহ। চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন গত মাসের তুলনায় কিছুটা বাড়ায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কমে গেছে।
কাপ্তাই এর কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে সচল আছে তিনটি ইউনিট । অন্য দুটি ইউনিট মেরামতের জন্য বন্ধ আছে। কিন্তু কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে যাওয়ায় এই তিন ইউনিট থেকেও কাঙিক্ষত মাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। সচল থাকা ১, ২ ও ৫ নম্বর ইউনিট থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে উৎপাদিত হয়েছে দৈনিক ১৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। গতকাল রোববার এই তিন ইউনিট থেকে পাওয়া গেছে ১২০ মেগাওয়াট। সূত্র জানায়, এই সময়ে হ্রদের পানির উচ্চতা থাকার কথা ৯২ দশমিক ২ মিনস সি লেভেল (এমসিএল)। কিন্তু বর্তমানে হ্রদের পানির উচ্চতা ৮৩ দশমিক ৮১ এমসিএল। এছাড়া ৩ নম্বর ইউনিটটি ওভারহলিং এর জন্য প্রায় দুই বছর যাবৎ বন্ধ আছে।। এছাড়া কাপ্তাই এ আরো দুটি ইউনিট চালুর বিষয়ে পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এবিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে পিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান। নতুন দুটি ইউনিট চালু করা হলে আরো প্রায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে সূত্র জানায়। সম্প্রতি ৪ নম্বর ইউনিটটিও মেরামতের জন্য বন্ধ করা হয়েছে
উল্লেখ্য, গ্যাস সরবরাহের অভাবে প্রায় চার মাস বন্ধ থাকার পর চলতি মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে আবার চালু হয়েছে রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটটি । এই কেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ৩৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। বর্তমানে ১ নম্বর ইউনিট থেকে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। শিকলবাহা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রর উৎপাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৪৭ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ মেগাওয়াট। জানা গেছে, শিকলবাহা ও রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটি চালু রাখতে মোট ১০৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমসিএফ) গ্যাস প্রয়োজন। এর বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ এমসিএফ গ্যাস।
এদিকে, সরকারি মালিকানাধীন ‘শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের’ নির্মাণ কাজ আগামী মে মাসে শেষ হতে পারে । কিন্তু এই কেন্দ্রটিতেও প্রাথমিকভাবে গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্টরা আশংকা করছেন নির্মাণ কাজ শেষ হলেও গ্যাস সরবরাহ করা না হলে হয়তো উৎপাদন সম্ভব হবে না। বেসরকারি মালিকানাধীন বাড়বকুণ্ডের রিজেন্ট পাওয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২১ মেগাওয়াট এবং শিকলবাহা রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫২ থেকে সর্বোচ্চ ৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন