শুক্রবার, ৫ মার্চ, ২০১০

ফটিকছড়িতে অমানবিক শিশু শ্রম--------ফয়সল অভি



ফটিকছড়িতে অমানবিক শিশু শ্রম

ফয়সল অভি


বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ৩৪ধারায়; কোন পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে কোন শিশুকে নিয়োগ দেওয়া বা কাজ করতে দেওয়ার ব্যাপারে নিষেধ থাকলেও ফটিকছড়ি উপজেলার বাগান বাজার, নারায়ণহাট, দাঁতমারা, হারুয়ালছড়ি, সুয়াবিল, নানুপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং তকিরহাট, আজাদী বাজার, নানুপুর বাজার, নাজিরহাট, কাজিরহাট, খিরাম বাজার, সদর বিবিরহাটসহ সকল বাজারে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু শ্রমিক লক্ষ্য করা যায় । চোদ্দ বছরের নীচে এসব শিশু প্রচণ্ড অমানবিকভাবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কিন্তু সরকার ও প্রশাসন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই অমানবিক শিশু শ্রমের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন যা খুবই হৃদয় বিদারক । 

 

১৪বছরের কম বয়সী হাজার হাজর শিশু বাজারে মালামাল বহনকারী, বাসের হেল্পার, চায়ের দোকানে বয়, ওয়ার্কশপে বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি পরিচালনাকারী, কাঠমিস্ত্রি শ্রমিক, মোটর গ্যারেজ শ্রমিক , জিপ-ট্যাক্সি-মাইক্রো-পিকাপ-ঠেলাগাড়ি ও কৃষিকাজের শ্রমিক হিসেবে ফটিকছড়ির সর্বত্র শিশু শ্রম দিয়ে যাচ্ছে । এসব শিশু শ্রমিকরা যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ।  উক্ত শিশু শ্রমিকরা দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে সুযোগ সন্ধানীরা তাদেরকে দিয়ে নানাবিধ অপরাধজনক কাজ যেমন  মাদক পাচার, অস্ত্র পাচার ও অস্ত্র বহন করিয়ে থাকে । এর ফলে, অনেক শিশুই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে যা জাতির জন্য হুমকি স্বরূপ । আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এসব শিশুদের অবৈধভাবে শ্রমে নিয়োজিত করেও নিয়োগদাতারা তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্য দেয় না; বেশী ভাগ শিশুদেরকে পেটে-ভাতে শ্রম দিয়ে যেতে হয় কোন রূপ অর্থ প্রদান না করে । দরিদ্রতার  সুযোগ নিয়ে এভাবেই দরিদ্র শিশুদের একপ্রকার শোষণ করছে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ যা সংবিধান, মানবতা ও ধর্ম বিরোধী ।

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ১৪, ১৫, ১৭, ১৮  ৩৪; Universal Declaration of Human Rights (UDHR)  এর ২৫ধারা ও UN Convention on the Rights of the Child (CRC) এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ৩৪, ৪০, ৪২, ৪৪ দ্বারা শিশু অধিকার নিশ্চিত করা হলে বাস্তবক্ষেত্রে এসবের কোন প্রতিফলনই নেই । বাংলাদেশ শ্রম ২০০৬ মোতাবেক এসব অনৈতিক শিশুশ্রম দণ্ডনী হলেও প্রশাসন কখনও কোন পদক্ষেপ নেয়নি । মানবাধিকার সংস্থা ও প্রশাসন ফটিকছড়ির এই অমানবিক শিশু শ্রম বন্ধে কোন রূপ উদ্যোগই নিচ্ছে না । গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো শিশু অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ নিলেও ফটিকছড়িতে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজও তেমন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি । বরং যে সময় শিক্ষা অর্জন করে শিশুরা তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে এগিয়ে যেতো আজ ফটিকছড়ির সেই হাজার হাজার দরিদ্র শিশুরা শিক্ষা হতে বঞ্চিত হয়ে আজীবন স্বার্থান্বেষীদের দাস হয়ে থেকে যাচ্ছে । একটা প্রজন্ম ক্রমশঃ ধ্বংস যাচ্ছে এভাবেই সুকৌশলে; এর কোন প্রতিকার কি নেই? এই অনৈতিক শিশু শ্রম বন্ধ ও শিশুদের যথাযথ পুণর্বাসন কি আজীবন অর্থ লুটে বিষয়বস্ত হয়েই থেকে যাবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে ।


তথ্য পরিচালনায়> "নতুন সূর্যোদয়" চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ।


রাঙ্গামাটি ও রাঙ্গুনিয়ার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংঙ্কা----ফয়সল অভি



রাঙ্গামাটি ও রাঙ্গুনিয়ার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংঙ্কা

ফয়সল অভি

০৩.০৩.১০




ইট পোড়ানো(নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৮৯ এর ৫ধারা মোতাবেক; জ্বালানী দ্বারা ইট পোড়ানো নিষিদ্ধ অর্থাৎ কোন ব্যক্তি ইট পোড়ানোর জন্য বাঁশের মরা মোথা ব্যতীত অন্য কোন উদ্ভিদ জাত জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করবেন না । কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উক্ত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার উত্তর রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর, রাজানগর, দক্ষিন রাজানগর, রানীর হাট, মঘাছড়ি, ঠান্ডাছড়ি, দক্ষিন রাঙ্গুনিয়ার কোদালা, চন্দ্রঘোনা ও হোসনাবাদ ইউনিয়নের এলাকায় এবং রাঙ্গামাটির কাউখালী, চট্রগ্রাম-রাঙামাটি প্রধান সড়কের পার্শ্বে শত শত ইটভাটায় ইট পুড়িয়ে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে যাচ্ছে । বর্তমানে রাঙ্গুনিয়া ও রাঙ্গামাটি এই দুই অঞ্চলে প্রায় ৮০-৯২টি পর্যন্ত ইটভাটা রয়েছে যেখানে অবৈধ জ্বালানী ও মাটি কেটে ইট বানানো হচ্ছে প্রকাশ্যেই ।

পরিবেশ অধিদপ্তর ইটভাটা ছাড়পত্রের নীতিমালায় পার্বত্য জেলা সমূহের সীমান্তে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না এবং এই সম্পর্কে বিধি নিষেধ আরোপিত আছে । সুর্নিদিষ্ট শর্ত; বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে ১২০ ফুট চিমনি ও উন্নত প্রযুক্তি মাধ্যমে পাহাড়ী অঞ্চলে ইট ভাটা স্থাপনের নীতিমালা রয়েছে । সেই নীতিমালা মোতাবেক নিদিষ্ট সময় অন্তর ইটভাটা নবায়ন ও শর্ত পূর্ণ প্রতিষ্ঠা না হলে ইট পোড়ানো(নিয়ন্ত্রণ) আইন-১৯৮৯ বিধান মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে ।

কিন্তু বাস্তব চিত্র অনুসন্ধান প্রেক্ষাপটে আইনের সাথে ভিন্নতা সুস্পষ্ট । সরকারী প্রশাসন সুত্রে, রাঙ্গামাটি জেলায় ইট ভাটা রয়েছে ২৩টি এর মধ্যে কাউখালী উপজেলায় ১৪টি, রাজস্থলী উপজেলায় ৪টি, বাঘাইছড়ি ২টি, লংগদু ৩টি ও রাঙ্গামাটি সদর ২টি এবং রাঙ্গুনিয়ায় উপজেলার ৮৬টি ইটভাটা রয়েছে । এসব ইটভাটার মধ্যে অনেকগুলোই সরকার থেকে কোন রূপ অনুমোদন না নিয়েই অবৈধভাবে ইট ভাটা স্থাপন করেছে । এসব ইটভাটায় পাহাড়ের মাটি রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে অবাধে কেটে নেওয়া হচ্ছে ইটের কাঁচামাল হিসেবে এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে ইট পোড়ানোর জন্য । আরো লক্ষণীয় যে, বিভিন্ন ধানী ও আবাদি জমির মাটি কেটে ইট বানানো হচ্ছে, এর ফলাফলে উক্ত আবাদি জমিগুলো উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে এবং জমিতে ফলন হচ্ছে না তাই এসব অঞ্চল থেকে যেসব শস্য পূর্বে উৎপন্ন হতো তা আর হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ সময়ে এর ফলাফল বাংলাদেশের খাদ্যের উপর প্রভাব পড়বে সুনিশ্চিত । অন্য দিকে, রাঙ্গামাটি ও রাঙ্গুনিয়া এই দুই অঞ্চলে ইট ভাটাগুলো আইন অমান্য করে ৪০-৫০ফুট কাঁচা চিমনি ব্যবহার করছে এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের আশেপাশেও নেই। এতে ভয়াবহ আকারে বায়ু দূষণ হচ্ছে যার কারণে উক্ত অঞ্চল বাসী থাইরয়েড সমস্যা , টিউমার, ক্যান্সার, এজমা, ব্রংকাইটিস, বুক ব্যথা, সর্দি কাশিসহ নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ধরনের প্রকাশ্য হুমকিস্বরূপ । আরো একটি ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, কিছু কিছু ইট ভাটা ইট পোড়ানোর জন্য ভারতের মেঘালয় থেকে অত্যন্ত নিম্নমানের কয়লা আমদানি করে ব্যবহার করছে । এসব কয়লার মান এতো নিম্ন যে এগুলো হতে সালফার হয় অত্যধিক পরিমানে নির্গত হয় যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ এবং উচ্চ মাত্রায় সালফার নির্গমনকারী কায়লাও ব্যবহার নিষিদ্ধ ইট ভাটায় কিন্তু তা কেউ মানছে না । সর্বোপরি, ইট ভাটার কাঁচামালের জন্য যেভাবে অবিরাম পাহাড় কাটা ও বৃক্ষ নিধন হচ্ছে তাতে চট্টগ্রামের উক্ত দুই অঞ্চলের প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের শেষ প্রাপ্তে এসে দাঁড়াতে খুব বেশী সময় লাগবে না।

প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন আইন অমান্য করে পরিবেশ ও জনমানুষের যে ক্ষতিসাধন করে যাচ্ছে কিছু ক্ষমতাসীন পরিবেশ বিরোধী মানুষ । তাদের প্রতিরোধে প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কিছু জরিমানা করেই তাদের দায়িত্ব পালন করেছে মাত্র যা অত্যন্ত দুঃখজনক । এসব ইটভাটার কর্মকাণ্ড এবং রাঙ্গামাটি ও রাঙ্গুনিয়ার প্রকৃতি পরিবেশন সংরক্ষণে প্রশাসন কোন অজানা কারণে সুর্নিদিষ্ট নজরদারি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ থেকে বিরত রয়েছে । আমরা আশা করব, প্রশাসন আইনের সঠিক প্রয়োগ ও নজরদারীতে রাঙ্গামাটি ও রাঙ্গুনিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুন্ন রেখে জনসাধারণকে একটি নিরাপদ বাসযোগ্য পরিবেশ দিতে সক্ষম হবে ।


Update>>> জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্টেট খন্দকার নুরুল হক এর নেতৃত্বে বিএসটিআই চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, র‌্যাব ও জেলা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত মোবাইল কোর্ট গত ৪ই মার্চ বৃহস্পতিবার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আধুনগর গ্রামের গুমাইবিল এ অবস্থিত হাজী নবীর হোসেন এর মালিকানাধীন ‘কেবিএম ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং এ অভিযান পরিচালনা করেন। উক্ত ইটভাটার লাইসেন্স না থাকায় এবং জ্বালানি কাঠ পুড়ানোর অভিযোগে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযান দল বেশকিছু জ্বালানি কাঠও জব্দ করে। জনস্বার্থে জেলা প্রশাসনের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে প্রশাসন সূত্র জানায় ।


তথ্য পরিচালনায়> "নতুন সূর্যোদয়" চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ।