
জামালখানের কাশেম কন্ট্রাক্টরের বাড়িতে প্রশিক্ষণ নিত গেরিলারা
রিটন আহসান
আমার মা মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার তৈরির কাজটিই করতেন প্রধানত। তবে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি করতেন তা হল যোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা। আমাদের টিনশেড ঘর ছিল। মা কোথায় এত অস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন তা আজো আমাদের কাছে অজানা রয়ে গেছে।
কথাগুলো বলছিলেন জামাল খান লেইনের মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দাতা আবুল কাসেম কন্ট্রাক্টরের পুত্র মোহাম্মদ আবুল হাসেম। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম আশ্রয় কেন্দ্র।
আবুল হাসেম জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বাড়ির সামনে কিছু টিনশেড ঘর ছিল। এখানে মোহাম্মদ আলী ও নুরুল আফসার বাসা ভাড়া নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। পাশাপাশি এই বাড়িতে গেরিলা দল কর্ণফুলী কোম্পানি- ৩ (কেসি-৩) এর সাথে সম্পর্কিত যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হত। এখানে ১৫/২০ জন যুবক থাকত। পরবর্তীতে তারা মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এদের কাছে মাঝে মাঝে আসত আসকার দীঘির পাড়ের আলী আবদুল্লাহ, রাউজানের নাজিম, এতিমখানার ছাত্র ফরিদ, ডা. মাহফুজুর রহমানসহ আরো অনেকে।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাসেম আরো বলেন, বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আসার কোন নির্দিষ্ট সময় ছিল না। তারা তাদের সুবিধা মত যখন তখন চলে আসতেন। আর তখন রান্নাবান্নার ভার পড়ত আমার মা আমেনা খানমের ওপর। খাবার নিয়ে কখনোই কেউ উচ্চবাচ্য করেননি মা যখন রান্না করতেন তাই পরমানন্দে খেয়ে নিতেন বাড়ির সবাই।
বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান বুঝতে পেরে একাধিকবার রাজাকার ও আল শামস বাহিনীর লোকজন বাড়ি ঘেরাও করেছিল। তবে কখনোই কাউকে খুঁজে পায়নি তারা। এসময় এলাকার সবচেয়ে বড় ত্রাস ছিল আলশামস বাহিনীর খোকা। অবশ্য দেশ স্বাধীন হবার কয়েকদিন পরই তাকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলে।
এসময়কার একটি দিনের পর থেকে তাদের বাড়িটি অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে বলে জানান আবুল হাসেম। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হবার পর একদিন আমি এবং বন্ধু তাপস সেনগুপ্ত লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় সিটি কলেজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। সাথে ছিল একটি বন্দুক। এসময় দেখি কলেজের পাশে একটি অস্ত্রাগার থেকে যে যার মতো অস্ত্র লুঠ করে নিচ্ছে। দেখে আমারও লোভ হলো। দুই বন্ধু মিলে লুঙ্গির কোঁচর ভরে বেশকিছু কার্তুজ নিলাম।
কিছুদিন পর একদিন শুনি তাপস এলাকা ছেড়ে আনোয়ারায় চলে গেছে। তার বাসায় গিয়ে দেখি চারদিকে ছিটিয়ে আছে অনেক গোলাবারুদ। তাপসের বিপদ হতে পারে ভেবে আমি আরেক বন্ধু রতনকে নিয়ে এসব গোলাবারুদ কুড়িয়ে নিই এবং রতনদের বাসার পাশে মাটি খুঁড়ে পুতে রাখি। এরপর রাতে আর ঘুম আসে না। একধরনের আতংক কাজ করে আমার ভেতর। ভাবতে থাকি যদি রতনকে পাক বাহিনী কিংবা শত্রুপক্ষের কেউ ধরতে পারে তাহলে নিজেকে বাঁচানোর জন্য রতন সব বলে দিতে পারে। একপর্যায়ে সবার অলক্ষে বাসা থেকে বের হয়ে যাই এবং পুতে ফেলা গোলাবারুদ অন্যত্র সরিয়ে ফেলি। তার মাত্র কয়েকদিন পর রতন ধরা পরে আলশামস বাহিনীর সদস্য খোকার হাতে। তাদের নির্যাতনের এক পর্যায়ে রতন সবকিছু ফাঁস করে দেয়। রতনের দেখিয়ে দেয়া তথ্য মতে শামস বাহিনীর লোকজন আগে পুতে রাখা স্থান খুঁড়ে অস্ত্রের সন্ধান চালায়। কিন্তু এর আগেই তা সরিয়ে ফেলার কারণে তারা কিছুই পায়নি। এরপর বাড়ির লোকজন আমাকে পাঠিয়ে দেয় গ্রামের বাড়ি হাটহাজারীর মাদার্শা গ্রামে।
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে আবুল হাসেম বলেন, আমাদের স্বপ্ন ছিল শোষকের হাত থেকে মুক্তি লাভ করা। কারো কাছে পরাধীন না থাকা। কিন্তু সেই স্বপ্ন কার্যত বাস্তবায়ন হয়নি এখনো। তিনি বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানীদের শোষনের হাত থেকে মুক্তি মিললেও এখন শোষিত হচ্ছি নিজেদের একটি অংশের মাধ্যমে। তবুও শান্তি যে, আমরা এখন স্বাধীন। অন্তত নিজের মত করে কিছু একটা করতে সাহস পাই। যা সে সময় করা যেত না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন