
অপরাধীরা বেপরোয়া পর্যটকরা আতঙ্কে
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পেয়েছে। একের পর এক অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, খুন ও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে পর্যটকসহ সাধারণ মানুষ।
পুলিশ ও নির্ভিরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র পর্যটন নগরীকেই এখন তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের অন্যতম পছন্দের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। ফলে পর্যটন নগরীতে বেড়ে গেছে নারী-শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, খুন করে গাড়ি ছিনতাইয়ের মতো সব অপরাধ। এসব ঘটনা নিয়ে পুলিশও বিব্রত।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অপরাধী চক্রের সদস্যরা পর্যটন নগরীতে ছদ্মবেশে নানা পেশায় জড়িত থেকে শিকার ধরছে। তাদের একটি অংশ কাজ করছে শহরে রিকশা ও অটোরিকশা চালকের বেশে। পর্যটকদের নিয়ে বেড়ানোর সময় তারা সখ্য গড়ে তুলে কৌশলে কাঙ্ক্ষিত স্থানে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় অথবা ছিনতাই করে ছেড়ে দেয়। কেউ সৈকতে হকারের ছদ্মবেশে কাজ করে। তারা পর্যটকদের মাদক বা নারীর প্রলোভনে ফেলে গোপন স্থানে নিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা পর্যটকবেশে বেড়ানোর কথা বলে গাড়ি ভাড়া করে। পরে ড্রাইভারকে হত্যা করে গাড়ি ছিনতাই করছে। গত এক মাসেই এ ধরনের তিনটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় দুই ড্রাইভারকে হত্যা করেছে অপরাধীরা। অন্য একটি ঘটনায় ড্রাইভার এখনও নিখোঁজ। পুলিশ জানিয়েছে, কক্সবাজারে অপরাধে জড়িত এরকম কয়েকটি অপরাধী চক্রের তথ্য তাদের হাতে এসেছে। যারা নগরীতে অপহরণ, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত। পুলিশ তাদের গ্রেফতারে অভিযানও শুরু করেছে। এই চক্রের ৩ সদস্যকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অপহরণকারী চক্রের আস্তানা থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছে শহরের পশ্চিম বাহারছড়া এলাকার হারেজ মোশারফা (১৪) নামে এক কিশোরী। গত ১২ ফেব্রুয়ারি তাকে অপহরণ করে চট্টগ্রামে নিয়ে যায়। ৬ দিন বন্দি রাখার পর অন্য এক চক্রের কাছে বিক্রি করার সময় কিশোরী কৌশলে পালাতে সক্ষম হয়। কিশোরীর দেওয়া তথ্য মতে, পুলিশ অভিযান চালিয়ে অপরাধী চক্রের ৩ সদস্যকে আটক করেছে। তারা হচ্ছে পেশকারপাড়া এলাকার মোঃ ছৈয়দের ছেলে আবদুস শুক্কুর (৪০), বাহারছড়া এলাকার নাছির উদ্দিনের মেয়ে আমেনা (২০) এবং স্ত্রী ফাতেমা (৩৮)। অপহরণের শিকার কিশোরী মোশারফা জানিয়েছে, আমেনা তাকে বেড়ানোর কথা বলে নাছির উদ্দিনের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে আটকে রেখে চট্টগ্রামে দলের অন্য সদস্যদের কাছে পাচার করে দেওয়া হয়। পুলিশ বলেছে, আটক ৩ জনই সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তাদের নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন ঢাকার ব্যবসায়ী হারুন রশিদ। শহরের লাইট হাউস এলাকায় বেড়াতে গেলে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা তার দুই শিশুর গলায় ছুরি ধরে সর্বস্ব ছিনতাই করে। পরে দুই শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে চাইলে তারা স্বামী-স্ত্রী জীবনবাজি রেখে বাধা দেয়। এ সময় দুর্বৃত্তদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে দুজনই গুরুতর আহত হন। তাদের চিৎকারে লোকজন এগিয়ে এলে অপহরণকারীরা পালিয়ে যায়। সহপাঠীদের নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন নওগাঁ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী পাভেল জোয়ার্দার। গত ১৯ জানুয়ারি হোটেল-মোটেল জোনের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে তাকে কৌশলে অপহরণ করে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা। তিনি জানান, এক রিকশা চালকের সঙ্গে ঘুরতে বের হন। রিকশাচালক তাকে নিয়ে এক দোকানে চা খায়। এরপর জ্ঞান ফিরলে নিজেকে দেখতে পান একটি কক্ষে বন্দি অবস্থায়। ৩ দিন পর মুক্তিপণ নিয়ে পাভেলকে চট্টগ্রাম থেকে মুক্তি দেয় অপহরণকারী চক্র। গত ১ জানুয়ারি বিকেলে কক্সবাজার বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে অপহৃত হয় উখিয়ার এক কিশোরী। সড়কের পাশে তাকে দাঁড় করিয়ে ভাই মোবাইল কার্ড কিনতে যান। ফিরে এসে বোনকে আর পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, একটি মাইক্রোবাস উঠিয়ে নিয়ে গেছে কিশোরীকে। এখনও পর্যন্ত তার কোনো হদিস নেই। গত ৩১ ডিসেম্বর কক্সবাজার কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠান শেষে মাইক্রোবাসে বাড়ি ফিরছিল সৈকতপাড়ার আশরাফ জামান চৌধুরীর মেয়ে তামীম তারিক মুত্তারিন ঝিনুক চৌধুরী। মাইক্রোচালক তার মুখে রুমাল চেপে ধরে অজ্ঞান করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে কুড়িগ্রামে বন্দি অবস্থা থেকে অন্য এক মেয়ে কৌশলে পালাতে সাহায্য করে তাকে। ঝিনুক এখন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে পুলিশের নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে পর্যটকবেশে মাইক্রোবাস (নং-ঢাকা মেট্রো চ-১৪-২১২১) ভাড়া করে কক্সবাজার এসেছিল সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের এক নারীসহ ৪ সদস্য। গত ১৫ জানুয়ারি শহরের কলাতলীতে সি-ভিউ নামে একটি অ্যাপার্টমেন্ট হাউজে ড্রাইভার প্রদীপ দাশকে (৩২) হত্যা করে মাইক্রোবাসটি নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে আরও এক ড্রাইভারকে হত্যা করে কক্সবাজার সদরের এসএম ঘাট ব্রিজের কাছে লাশ ফেলে দিয়ে তার গাড়ি ছিনতাই করে নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত। কক্সবাজার বেড়াতে আসার কথা বলে গাড়িটি চট্টগ্রাম থেকে ভাড়া করা হয়েছিল। এভাবে একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হলেও পুলিশ কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতে, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা ছিনতাই, ডাকাতি, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হচ্ছে। দেশের অন্যান্য এলাকার সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রও তাদের সঙ্গে পর্যটন শহরে আস্তানা গেড়েছে। কক্সবাজার থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান, ছিনতাইকৃত গাড়ি উদ্ধার ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারে তারা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি জানান, পর্যটন শহরে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসছে। সীমিতসংখ্যক পুলিশের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা খুবই কঠিন কাজ। তবুও তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
তথ্যসূত্র: বাংলা আই ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন