শনিবার, ৬ মার্চ, ২০১০

চট্টগ্রামের লবণচাষী হতাশায় নিমজ্জিত


হতাশায় নিমজ্জিত লবণচাষী

এম.আবদুল্লাহ আনসারী 



নিত্যপ্রয়োজীনয় দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি আর লবণের দাম মাত্রাতিরিক্ত নিম্নমুখী হওয়ায় মাঠপর্যায়ের কৃষকের মাঝে দিনদিন হতাশা বাড়ছে। মাঠ পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ লবণ অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকলেও সরকার কতিপয় আমদানিকারককে বিনাশুল্কের ৫ লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী লক্ষাধিক লবণ চাষী চরম বিপাকে পড়েছে। এতে দেশীয় লবণশিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন মৌসুমে সরকারের লবণ আমদানির এ সিদ্ধান্তটি আত্মঘাতী ও দেশীয় লবণ শিল্পের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাদের অভিযোগ, একটি মাত্র অঞ্চলের উৎপাদিত লবণ সারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা সম্ভব হলেও অমিত সম্ভাবনার লবণ শিল্পের বিকাশে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।


জানা গেছে, লবণ শিল্পের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে আশির দশকের লবণ বোর্ড গঠন করা হলেও রহস্যজনক কারণে তারা আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) লবণ শিল্পের আধুনিকায়ন, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে আসছে। কেবল এই প্রতিষ্ঠানটি ছাড়া লবণ চাষীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। এ অঞ্চলের লক্ষাধিক লবণ চাষী মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখলেও তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা।


সরেজমিনে গিয়ে লবণ চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এক একর লবণ মাঠে প্রায় আট থেকে নয়শ মেট্রিকটন লবণ উৎপাদিত হয়। বর্তমানে চাষীরা মাঠ পর্যায়ে মণ প্রতি দাম পাচ্ছেন মাত্র ৭০ থেকে ৮০ টাকা । অথচ বিগত সনে এ মৌসুমে লবণের দাম ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী লাভতো দূরের কথা চাষীদেরকে উল্টো প্রতি একরে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে।


বিসিক সূত্রে জানা গেছে, বিগত মৌসুমে লবণের চাহিদা ছিল এক লাখ বিশ হাজার মেট্রিকটন। কিন্তু আবহাওয়ার অনুকুল পরিবেশ ও পলিথিন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনে বাম্পার ফলন হওয়ায় সেবার প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিকটন লবণ উৎপাদনের রেকর্ড সৃষ্টি করে। কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী (আংশিক) এলাকায় প্রায় ৭৭ হাজার একর জমিতে সরাসরি এক লাখ প্রান্তিক চাষী লবণ উৎপাদনের সাথে জড়িত রয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতিবছর নভেম্বর থেকে প্রায় ৫/৬ মাস একটানা লবণ উৎপাদিত হয়। গত ৫ বছরে বিসিক উদ্ভাবিত পলিথিন পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে সাদা লবণ উৎপাদন শুরু করে কৃষকরা সফলতা পান। বিগত ১০ বছরে চাহিদার অতিরিক্ত লবণ উৎপাদন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বলে বিসিক সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মায়ানমার থেকে লবণ লবণ আমদানি করায় দেশীয় কৃষকদের কাছে রক্ষিত লবণ বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিসিক সূত্র জানিয়েছে, নিজস্ব লবণ প্রদর্শনী খামারগুলো বার বার টেন্ডার আহবান করার পরও ক্রেতা পাচ্ছে না।


চকরিয়া পেকুয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসিনা আহমদ, কুতুবদিয়া মহেশখালী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এ.এইচ.এম. হামিদুর রহমান আযাদ, পেকুয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু ও কুতুবদিয়া বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক আ.স.ম. শাহরিয়ার চৌধুরী জানান, দেশের লবণ শিল্পকে বাঁচাতে হলে এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের বিকল্প নেই। লবণ শিল্পের সাথে জড়িত কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিশ লাখ জনগণের প্রতি প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টি না দিলে লবণ শিল্পকে মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করা যাবেনা।


লবণ শিল্পের দুর্যোগ থেকে উত্তরণ সম্পর্কে সংসদ সদস্য হাসিনা আহমদ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, লবণ শিল্পকে বাঁচাতে উক্তঅঞ্চলের গণমানুষের প্রাণের দাবি লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এদেশের উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষার জন্য উপকূলীয় লবণ জোনের জন্য আলাদা বরাদ্দ ঘোষণার জন্য সরকারের প্রতি তিনি দাবি জানান। লবণ আমদানি বন্ধ করে লবণের ন্যায্যমূল্যের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।


কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকায় চলতি মৌসুমের লবণ উৎপাদন প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হয়েছে। বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এ মুহূর্তে লবণের বাজারমূল্য নিয়ে চাষীরা হতাশায় ডুবে আছে। এদিকে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিসিকের ৪টি লবণ প্রদর্শনী খামারে প্রায় ৪ শত একর জমি এখনো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে লবণ উৎপাদন প্রদর্শনী খামারে জড়িত শত শত মৌসুমী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।


বিসিক পরিচালিত ৪টি লবণ উৎপাদন প্রদর্শনী খামার গুলো হচ্ছে কুতুবদিয়া, মাতারবাড়ী, চৌফলদন্ডি ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী। এর মধ্যে কুতুবদিয়া লবণ প্রদর্শনী খামারটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়। এ ৪টি খামারে প্রতি বছর নভেম্বর মাস থেকে মৌসুমী শ্রমিক নিয়োগ করে আধুনিক প্রযুুক্তি পলিথিন পদ্ধতিতে সাদা লবণ উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় হতে ফান্ড অনুমোদন জটিলতার কারণে খামারগুলোতে লবণ উৎপাদন প্রক্রিয়া অনেক বিলম্বে শুরু হয়েছে বলে সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


বারবার টেন্ডার আহ্বান করেও ক্রেতা না পাওয়ায় গত মৌসুমের উৎপাদিত লবণ এখনো বিসিক এর গুদাম ভর্তি হয়ে পড়ে আছে। ইতিমধ্যে লবণ উৎপাদন মৌসুম প্রায় শেষের দিকে হলেও বিসিক’র ৪টি লবণ উৎপাদন প্রদর্শনী খামার অযন্তে অবহেলায় অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এতে একদিকে সরকারের আর্থিক ক্ষতি অন্যদিকে খামার সংশিষ্ট শত শত কর্মকর্তা কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ছে । 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন