সোমবার, ৮ মার্চ, ২০১০

জুমের আগুনে পুড়ছে বান্দরবানের সবুজ পাহাড়


জুমের আগুনে পুড়ছে বান্দরবানের সবুজ পাহাড় মিলন চক্রবর্তী

জুমের আগুনে পুড়ছে বান্দরবানের সবুজ পাহাড়। পাহাড়ে জুম চাষের কারণে বৃক্ষ শূন্য হয়ে পড়েছে পাহাড়গুলো। পাহাড়িদের লাগানো জুমের আগুনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পার্বত্যাঞ্চলের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি। বছরের পর বছর পাহাড়ে আগুন দিয়ে জুম চাষের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীজ সম্পদ। জুমিয়া পরিবারগুলো পাহাড়ে আগুন দিয়ে আদিপদ্ধতিতে জুম চাষ করে সারা বছরের খাদ্যশস্য ঘরে তুলতে পারলেও জুম চাষ প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিপন্ন করার পাশাপাশি মাটি ক্ষয় ও প্রাণীজ সম্পদের আশ্রয়স্থল ধ্বংস করে দেয়। এ কারণে পাহাড়ে পরিবেশ সম্মতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষের পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা।

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবানে এবার সর্বাধিক জমিতে জুম চাষের প্রস্তুতি নিয়েছে পাহাড়িরা। জেলায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টর পাহাড়ী জমিতে জুম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে গাছ-পালা, ঝাড়-জঙ্গল কেটে অনেক পাহাড়ে জুমের আগুন লাগিয়েছে পাহাড়িরা। জুমের আগুনে পুড়ছে এখন বান্দরবানের শত শত পাহাড়। কোথাও কোথাও আগুনে পোড়ানো পাহাড় জুম চাষের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেও দেখা গেছে। মূলত বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুমিয়ারা পাহাড়ে আগুন দেয় এবং মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড়ে জুম চাষ শুরু করে। তবে এবার একটু আগে থেকেই জুম চাষের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

ডলুপাড়া এলাকার বাসিন্দা ক্যশৈ উ মারমা জানায়, জুম ক্ষেত্রে বন্য ইঁদুরের আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইঁদুরের কারণে জুমের ফসল ঘরে তুলতে পারি না। মূলত ইঁদুরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে আগাম জুম চাষ করা হচ্ছে। জুমে পাহাড়ী ধান, ভুট্টা, মরিচ, যব সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, মারমা, টকপাতা এবং আধাসহ বিভিন্ন রকম সবজির চাষ করে। অপরদিকে কৃষিতথ্যবিদ আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, জুম চাষ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। জুমিয়া পরিবারগুলোর লাগানো আগুনে গাছপালা এবং বন্যপ্রাণী মরে যাচ্ছে। মাটি ক্ষয় হয়ে অল্প বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের সৃষ্টি হচ্ছে। সবুজ পাহাড়গুলো ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হচ্ছে। তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষ করা গেলে গাছপালা, বন্যপ্রাণী এবং পাহাড় ধস রোধ করা সম্ভব হবে।

মৃত্তিকা ও পরিবেশবাদী সংস্থার জরিপে দেখা গেছে জুম চাষের ফলে বনজ সম্পদ ধ্বংস হয়ে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস করে ভূমি ক্ষয় করছে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এসব কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হতে চলেছে। ভূমি অবক্ষয় সম্পর্কিত এক জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশে মোট পাহাড়ি ভূমির প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি এখন ক্ষয়ের মুখে। তার জন্য প্রধানত জুম চাষকে দায়ী করা হয়েছে।

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, জুম চাষ পরিবেশগতভাবে ক্ষতি হলেও সুফলও আছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর পাহাড়ে জুম চাষের প্রস্তুতি চলছে। জুমে ধানের পাশাপাশি মারফা, মরিচ, ভুট্টা, সরিষা, জব, তিল ও তুলাসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থকরি ফসল উৎপাদন হবে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশসম্মতভাবে জুম চাষ করলে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর কোন ধরনের প্রভাব পড়বে না। তবে বর্তমান পদ্ধতিতে জুম চাষ অব্যাহত থাকলে আগামী একদশকে সবুজ বনাঞ্চল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে তিনি কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে জুম চাষ করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করার আহবান জানান। জুমের আগুন নিয়ন্ত্রণে রেখে অথবা আগুন না দিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জুম চাষ করা সম্ভব। এ ব্যাপারে জুমিয়া পরিবারগুলোকে সচেতন করে তোলার বিষয়ে সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন মৃত্তিকার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা।

তথ্য সূত্র: ইত্তেফাক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন