
বক্সিরহাটের চিরায়ত সমস্যা যানজট
মঈন সৈয়দ
সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বক্সিরহাট ওয়ার্ডের অধিবাসীরা ।।। অথচ এখানে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। সড়কে সড়কে অবিরাম যানজটের অবর্ণনীয় ও দুঃখময় চিত্র থাকে প্রায়ই। ওয়ার্ডে নেই একটি সরকারি প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়। সঙ্গে পানির সমস্যা যেমন কুরে কুরে খাচ্ছে, তেমনি থাকে মশা-মাছির অত্যাচার। সমস্যার কাঁধে ভর করেই দিনাতিপাত করতে হচ্ছে এলাকাবাসীর। নানা সমস্যায় ঘুরপাক খেয়ে দিনাতিপাত করছেন তারা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র খ্যাত চাক্তাই খাতুনগঞ্জ এলাকা
যানজট যাদের নিত্যসঙ্গী
বক্সিরহাট, খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকার ব্যবসায়ী, পথচারী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক এবং বসবাসকারী সবার কাছে প্রশ্ন ছিল একটাইÑ ৩৫ নাম্বার বক্সিরহাট ওয়ার্ডের প্রধান সমস্যা কী? উত্তরও একটিÑ যানজট। এ যানজটের কোনো সময়সীমা নেই। দীর্ঘদিন ধরে সকাল কিংবা মধ্যরাত সবসময়ই নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে যানজট। এলাকায় চলাচলকারী যানবাহনের অধিকাংশই ট্রাক ও ঠেলাগাড়ি।
এ প্রসঙ্গে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুল আলম তালুকদার বলেন, ‘যানজটের কারণে ব্যবসায় নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। নগরীর অন্যান্য যানজট থেকে এ সড়কের যানজট ব্যতিক্রম। এখানকার যানজট শুরু হলেই স্থির থাকে অনেকক্ষণ, গাড়ি চলাচলের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।’ অভিন্ন অভিমত প্রকাশ করলেন, চট্টগ্রাম চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ এনামুল হক। বললেন, ‘যানজটের কারণে যথাসময়ে মালামাল লোড-আনলোড করা যায় না। ফলে আমরাও ঠিক সময়ে মালামাল সরবরাহ করতে পারি না। এতে আমরা আর্থিকভাবে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হই। যানজট থাকে সারাবছরই।’ এনামুল হক মনে করেন, নির্মাণাধীন মেরিন ড্রাইভ সড়ক চালু হলে এ যানজট কিছুটা কমবে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এ ওয়ার্ডের বেশিরভাগ গলি-উপগলি খুব সরু। খাতুনগঞ্জ ও আসাদগঞ্জের প্রধান সড়ক দুটিই পুরো ওয়ার্ডের সবচেয়ে প্রশস্থ সড়ক। দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী বিভিন্ন যানবাহন চাক্তাই চামড়া গুদাম সড়ক দিয়ে নগর থেকে বের হয়। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম বন্দর এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে মালামাল নিয়ে আসা গাড়িগুলোর বেশিরভাগই টেরিবাজার দিয়ে খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ, কোরবানিগঞ্জ এবং চাক্তাই এলাকায় প্রবেশ করে। এসব এলাকায় আছে অসংখ্য গুদাম। রাস্তার ওপরে গাড়ি দাঁড় করিয়েই চলে মালামাল ওঠানামা। গাড়ি থেকে মালামাল ওঠানামা করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ওয়ার্ডের অন্যান্য সড়ক ও গলি অত্যন্ত সরু হওয়ায় এক সড়ক থেকে অন্য সড়কে মালবাহী ট্রাক যাতায়াত করতে পারে না। ফলে খাতুনগঞ্জ এলাকায় চাক্তাইগামী ট্রাক আটকা থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
পানির সঙ্কট তীব্র
‘এটা নগরী হলেও ওয়াসার পানি পাওয়া যায় না। করপোরেশন কিন্তু আমাদের কাছ থেকে ঠিকই কর আদায় করে। শহরে থেকেও আমরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত বললেন কোরবানিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা নজির আহমদ। বক্সিরহাট ওয়ার্ডে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ অবস্থিত। কিন্তু এ ওয়ার্ডেই বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট তীব্র বলে এলাকার বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। জানা যায়, এখানে ওয়াসার পানি অনিয়মিত হওয়ায় বেশিরভাগ মানুুষের ভরসা সড়কের পাশে স্থাপিত গভীর নলকূপ। কিন্তু এ ব্যবস্থা জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় কম বলে মনে করেন অধিবাসীরা।। এদের বসবাস এলাকার বিভিন্ন বস্তিতে। বস্তিতে পানির সঙ্কট সব সময় থাকে বলে জানান রাজাখালী এলাকার বস্তিতে বাস করা শ্রমিক আবদুল্লাহ সরকার। তিনি বলেন, ‘ওয়াসার পানি তো নেই। কিন্তু গভীর নলকূপের পানিও লবণাক্ত, মাঝেমধ্যে আয়রনও থাকে পানিতে। কোনোমতে খেয়ে দিন খাটাই আর কী’।
কেমন আছেন চাক্তাই খাতুনগঞ্জের শ্রমিকরা
দেশের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র চাক্তাই খাতুনগঞ্জ। এখানে আছে সহস্রাধিক আড়ত, চালকল ও ময়দার মিল। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা কাজ করেন এগুলোতে। গাড়িতে মাল ওঠানামা করা, গুদাম থেকে দোকানে পণ্য আনা-নেওয়া করা, বিক্রিত মাল ডেলিভারি দেয়াসহ বিভিন্ন কাজ করে থাকেন শ্রমিকরা। একজন মাঝির অধীনে কাজ করেন ১৫-২০ জন শ্রমিক। এখানে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের কষ্টের জীবনের কথা। টিনের দোকানে কাজ করা শ্রমিক রফিক আজাদ বলেন, রাজাখালী বস্তিতে থাকি, সেখানে পানির ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্যসম্মত গণশৌচাগার নেই, সারাদিন পরিশ্রম করে রাতে পানির অভাবে অনেক সময় গোসলও করতে পারি না। চাল আড়তের শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, এক রুমে আমরা আট-দশজন শ্রমিক থাকি। কয়েকজন একসঙ্গে থাকলে ভাড়া একটু কম হয়। কিন্তু এখানে আমাদের বিভিন্ন সমস্যা সব সময় থাকে। এদিকে, ওয়ার্ডে আছে চাক্তাই খাতুনগঞ্জের অসংখ্য শ্রমিক
নেই একটিও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাসের এ ওয়ার্ডে সরকারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। সিটি করপোরেশন পরিচালিত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কলেজ। এ ছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে তিনটি প্রাইমারি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। আছে করপোরেশন পরিচালিত চারটি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। জানা যায়, এলাকার বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে এ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার সুযোগ থেকে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় অনেকের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মশা-মাছির উপদ্রব
বক্সিরহাট ওয়ার্ডে নানা সমস্যার সঙ্গে আছে মশা-মাছির উপদ্রব। গ্রীষ্ম মৌসুমে একটু কম থাকলেও বর্ষা ও শীত মৌসুমে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পায়। এ প্রসঙ্গে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নালা-নর্দমায় আবর্জনা জমে থাকার কারণে বর্ষা ও শীতকালে মশা-মাছির উপদ্রব বেশি হয়। সিটি করপোরেশনের স্প্রেম্যান আসলেও তা বেশ অপ্রতুল। আফরিন এন্টারপ্রাইজের মালিক ব্যবসায়ী রাশেদ উদ্দীন পারভেজ বলেন, নালা-নর্দমায় আবর্জনার কারণেই মূলত এখান থেকে মশা-মাছির উৎপত্তি হয়। যেহেতু এটা বাণিজ্যিক এলাকা, তাই এখানে অন্যান্য এলাকার তুলনায় আবর্জনা একটু বেশি হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন