ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যে সয়লাব চট্টগ্রাম-দুই মাসে ১০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ৫০ কোটি টাকার ভেজাল পণ্য আটক
স্বপন মল্লিক
ভেজাল ও নিম্ন মানের খাদ্যদ্রব্যে সয়লাব এখন চট্টগ্রাম । মান্ধাতার আমলের অকার্যকর আইন, ফুড টেস্টিং ল্যাবটেরির বেহাল অবস্থা এবং সর্বোপরি থেমে থেমে অভিযান পরিচালনার কারণে এই প্রাণ সংহারী অপকর্মটি অব্যাহত থাকলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে ভেজালকারীরা দ্বিগুণ উৎসাহে কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে দীর্ঘদিন পর গত ১লা মার্চ ম্যাজিস্ট্রেট অনুপম সাহার নেতৃেত্ব নগরীর স্টেডিয়াম এলাকায় পরিচালিত এক ভেজাল বিরোধী অভিযানে ৬ রেস্তোঁরাকে দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। পচাঁ-বাসি ও নষ্ট খাবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিবেশনের অপরাধেই তাদের এই অর্থদন্ড করা হয়।
সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাত্র এই দুই মাসে পরিচালিত একই ধরণের অভিযানে প্রায় ৫০ কোটি টাকার নষ্ট পণ্য আটক এবং বাসি তথা ভেজাল খাদ্য অস্বাস্থ্যকরভাবে পরিবেশনের দায়ে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এর সাথে জড়িত বেশ কয়েক ব্যবসায়ীকে করা হয় গ্রেফতার।
র্যাবসহ ভেজাাল বিরোধী অভিযানে অংশ নেয়া আইন প্রয়োগকারী সূত্র থেকে প্রাপ্ত এক হিসেবে দেখা য়ায়, গত ৫ অক্টোবর চকবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে নোংড়া খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের দায়ে চট্টেশ্বরী ও ক্যাফে জয়নগরসহ কয়েকটি হোটেল থেকে প্রায় এক লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়, গত ৬ অক্টোবর মেলামাইন থাকার অভিযোগে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত আগ্রাবাদ ও হাইওয়ে প্লাজা থেকে ৭৫৮ পিস ক্যাটবেরি চকলেট জব্দ করে।
এর মাত্র এক দিন পর ৭ অক্টোবর ওজনে কম দেওয়ায় একটি ফিলিং স্টেশন ও অসস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরির জন্য পাহাড়তলী এলাকা থেকে ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এলাকার মদিনা ফিলিং স্টেশন ও আলীফ বিরিয়ানী হাউসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে এই জরিমানা নেয়া হয়।
১৩ অক্টোবর র্যাব ও বি এস টি আই অভিযান চালিয়ে পঁচা বাসি খাবার পরিবেশনের জন্য হোটেল ব্রিজ ও হোটেল জমজমসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৭১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে। অন্য এক অভিযানে ১৫ অক্টোবর ষোলশহর এলাকায় এক যৌথ অভিযানে ফরমালিন দিয়ে মাছ বিক্রির অভিযোগে ২৬ জন মাছ ব্যাবসায়ীর কাছ থেকে ১৬ হাজার ৩শ টাকা জরিমানা করা হয়,একই মাসে এর মাত্র দুদিন পর ১৮ অক্টোবর ফিরিঙ্গিবাজারের কযেকটি দোকানকে পণ্যের গায়ে মেয়াদোত্তীর্ণে তারিখ না থাকায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
২৫ অক্টোবর র্যাবের এক অভিযানে আন্দরকিল্লা থেকে ফ্রিজে রেখে পঁচা খাবার সরবরাহের জন্য হোটেল জামান ও মদিনা হোটেল থেকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
নগরীর ভ্রাম্যমান আদালত ২৬ অক্টোবর বহদ্দার হাটের মাংস ও ফল ব্যবসায়ীদের বাটখারা পরীক্ষা করে কারচুপি পাওয়ায় ২৮ হাজার ৬শ ৫০ টাকা জরিমানা আদায় করে আট জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। চট্টগ্রাম বšদর থানায় ২৯ অক্টোবর একইভাবে অভিযানে জেটি গেট সংলগ্ন কয়েকটি হোটেল থেকে ৩৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে।
একপচাঁ বাসি ও নষ্ট খাদ্য সামগ্রী জব্দ করার সবচেয়ে বড় অভিযানটি চলে গত ৯ সেপ্টেম্বর। এই অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত নষ্ট ও খাবার অনুপোযোগী প্রায় ৫০ কোটি টাকার খাদ্য সামগ্রী জব্দ করে। নগরীর পাঁচল্ইাশ এলাকার রহমান নগরের বাংলাদেশ পেপার প্রোডাক্টের গুদাম থেকে এসব মালামাল উদ্ধার করা হয়। এই অভিযান পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট খোন্দকার নুরুল হক। তিনি এসব ভেজাল সামগ্রী জব্দ করেন। পণ্যগুলোর আমদানি কারক ই ও এম এবং টি আদ্যক্ষরের চট্টগ্রামের বড় তিনটি গ্রুপ অব কোম্পানি। জব্দকৃত সব মালামাল ছিল দুর্গন্ধ ও খাবার অনুপোযোগী।। এগুলো এক বছরের বেশি সময় এখানে রাখা ছিল।এই ব্যাপারে থানায় মামলা করা হয়।
গত ৬ সেপ্টেম্বর ভেজাল ঘি তৈরির অভিযোগে র্যাব ও বি এস টি আই এর যৌথ অভিযানে যমুনা ক্যামিক্যাল ওয়ার্কস ও তাহের ফুড প্রোডাক্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
একই মাসের ১৭ সেস্টেম্বর ওজনে কম ও পণ্যে ভেজাল দেওয়ায় ডবলমুরিং থানাধীন কর্ণফুলী মার্কেটের ৫ বিক্রেতার কাজ থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এর একদিন পর একই ধরনের আর একটি অভিযানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে সেমাই তৈরির অভিযোগে শহরের রাজাখালী এলাকার চানতারা সেম্ইা কারখানা, রাসেল সেমাই ও খাজা সেমাই কারখানাসহ মোট ৭ কারখানা থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। গত ৭ অক্টোবর ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে ওজনে কম দেয়ায় একটি ফিলিং ষ্টেশন ও নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরির অপরাধে ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। পাহাড়তলী এলাকার মদিনা ফিলিং স্টেশন এবং দূষিত খাবার তৈরি কর্য়া আলীফ বিরানী হাউস থেকে এই জরিমানা আদায় করা হয়। ভেজাল প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বেশকিছু রাসায়নিক পদার্থও পাওয়া যায় এই গুদামে
ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সিটি কপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট ড.অনুপম সাহা বলেন, নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে অভিযান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই এবার ভেজাল বিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন,ভেজালকারীদের অপরাধের তুলনায় বিদ্যমান আইনে খুব স্বল্প জরিমানার বিধান রয়েছে তাই সংশ্লিঠরা তা কেয়ার করেনা। ভেজাল পঁচা ও বাসি খাবার এবং ভেজাল ঘি ও তেল খেলে ভোক্তাদের কী কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে এমন এক প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বলেন, পচাঁ বাসি খাবার ডায়রিয়া, এসিডিটি,গ্যাস্ট্রিক ও আলসার হতে পারে, ভেজাল তেলে খোসপাঁচড়াসহ বিভিন্ন চর্মরোগ আর ভেজাল ঘিতে অমাশয়সহ আরো বড় ধরণের রোগ ব্যাধি হওয়ার আশংকা রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু তৈয়ব উপজেলা পর্যায়েও ভেজাল তৎপরতা রয়েছে বলে স্বীকার করে বলেন, জেলার ১৪ উপজেলায় একজন করে সেনিটারী ইন্সপেক্টর থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র৫/৬ জন। এব্যাপারে উর্ধতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। শূন্যপদ পূরণের আশ্বাস পেয়েছি।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন