লোডশেডিং : কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ ।। একদিকে নষ্ট হচ্ছে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী অন্যদিকে জেনারেটরের রমরমা ব্যবসা
॥ ঋত্বিক নয়ন ॥
গরম পড়তে না পড়তেই শুরু হয়ে গেছে বিদ্যুতের ভেলকিবাজি। মাঝে মধ্যে থাকে। যখন যে এলাকায় থাকে সেখানকার বাসিন্দারা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করে। কিন্তু বিদ্যুৎ “ক্ষণিক আসে, এসেই বলে যাই” নীতির ঘেরাটোপে আটকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের বাড়াবাড়িতে জেনারেটর, আইপিএস ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় জেনারেটর ব্যবসা চাঙা হয়ে উঠেছে। কিন্তু ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী বিক্রেতাদের অভিমত রাজস্ব খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ও মার্কেট ঘুরে ভুক্তভোগীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, চাহিদানুযায়ী বিদ্যুৎ না থাকায় প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী। মূলত: ক্ষণে ক্ষণে লোডশেডিং এবং দ্বিগুণ ভোল্টেজে তা ফিরে আসায় ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ভোক্তার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও লোকসান গুণতে হচ্ছে। জানা গেছে, নগরীতে আনুমানিক দেড় হাজার ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকান ও শো-রুম রয়েছে। নগরীর ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকান গুলোকে লাখ লাখ টাকা মাসুল গুণতে হচ্ছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া ও দ্বিগুণ ভোল্টেজে তা ফিরে আসায় প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার টিভি, ফ্রিজ, ডিভিডি, মিউজিক প্লেয়ার, মাইক্রো ওভেন, ব্লেন্ডার, বৈদ্যুতিক বাল্ব, এনার্জি সেভিং বাল্ব, ফটো কপিয়ার মেশিন, ফ্যাক্স মেশিনসহ অন্যান্য পণ্য। ফটো ল্যাবগুলোতে জ্বলে যাচ্ছে ছবি। সীমাহীন আঁধার দূর করতেও ব্যবসা ঠিক রাখতে ইলেকট্রনিক্ম ব্যবসায়ীরা জেনারেটর, স্টাবিলাইজার, আইপিএস কিংবা ইউপিএস-এর উপর নির্ভরশীল হয়েও ক্ষয়ক্ষতি সামলে উঠতে পারছেন না। ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর স্থাপনে রফতানিকারকদের তিন শতাংশ সরল সুদে ঋণ দেয়ারও দাবি করেছেন। এদিকে আইপিএস, ইউপিএস, স্টাবিলাইজার কিংবা জেনারেটরের উপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ার সুযোগে দামও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরাই স্বীকার করেছেন ডিসেম্বর বা জানুয়ারি থেকে বর্তমানে এ সকল পণ্যের দাম পাঁচশ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকা বেড়ে গেছে।
জানা গেছে, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং দ্বিগুণ ভোল্টেজে ফিরে আসায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী। বহদ্দারহাট মোড়ের ফটোস্ট্যাট ব্যবসায়ী শাহেদ সিদ্দিকী জানান, ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি গত বছর সেপ্টেম্বরে এ মেশিনটি কিনেছেন।
গত দুই মাসে তিনবার মেশিনটির ল্যাম্প নষ্ট হয়ে গেছে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে। গতকাল নষ্ট হলো চতুর্থ বারের মতো। একেকবার মেরামত করতে খরচ হয় দেড় হাজার টাকা। প্রতি ঘন্টায় ফটোকপি করে আয় হয় পাঁচশ টাকার মতো। আর এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে পুরোটাই লোকসান। আন্দরকিল্লাস্থ প্রজ্ঞা কম্পিউটারের পরিচালক রাকিব জানান, লোডশেডিং থেকে মুক্তি পেতে ইউপিএস কিনেছেন। কিন্তু তাতেও লাভ হয় নি। বিদ্যুতের ভেলকিবাজির কারণে একটি কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক নষ্ট হয়ে গেছে। মেরামতের খরচ হচ্ছে ৩৬০০ টাকা। মেরামত না হওয়া পর্যন্ত একটি কম্পিউটারেই কাজ করতে হবে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কালার প্রিন্ট ব্যবসায়ীরাও। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৮০০ ছবি প্রিন্ট করা যায়। ১ কপি ছবি ছয় টাকা করে ৮০০ কপি ছবিতে আয় হয় ৪৮০০ টাকা। একইভাবে ঘণ্টায় লস ৪৮০০ টাকা। এ ক্ষতি মেনে নিয়েই ক্রেতার মন রাখতে হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ে নগরবাসীর যখন সর্বনাশ, তখন একই কারণে জেনারেটর ব্যবসায়ীদের জন্য পৌষ মাসের বারতা বয়ে এনেছে। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠেছে জেনারেটর ব্যবসা। এককালীন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, একটি লাইট ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, ফ্যান ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে তারা। কিন্তু রাত ১২টার পর জেনারেটর বন্ধ করে দেয়ায় রাতে ঠিকই চার্জ লাইট ও চার্জার ফ্যানের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। শীত-গ্রীষ্ম কোন ভাগ নেই, লোডশেডিংয়ের কবল থেকে মুক্তি নেই যেন নগরবাসীর।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন