
জলাবদ্ধতাই অভিশাপ টিপু সুলতান
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার ফলে ত্রাহি অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় নগরীর অন্যতম বৃহৎ ও ঘনবসতিপূর্ণ ওয়ার্ড ২৪ নাম্বার উত্তর আগ্রাবাদের বাসিন্দাদের । একইসঙ্গে বিশুদ্ধ পানির অভাব, লোডশেডিং, সংস্কারের অভাবে দিনের পর দিন বেড়ে চলা সড়কগুলোর দুরবস্থায় নিত্য যানজট ও জনজটে অতিষ্ঠ করে তুলেছে নাগরিক জীবন। এছাড়া কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো গোপনে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য ভারসাম্যহীন করে তুলেছে এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এমন অসংখ্য সমস্যা আর সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের দাবি করেছে এলাকার জনসাধারণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত ২৪ নাম্বার ওয়ার্ডের পশ্চিমে পোর্টকানেকটিং রোড, পূর্বে শেখ মুজিব রোড, উত্তরে ঢাকা ট্রাংক রোড এবং দক্ষিণে রয়েছে আগ্রাবাদ এক্সেস রোড। এর মধ্যিখানে অবস্থিত উত্তর আগ্রাবাদের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৯৭ হাজার। ২১টি আবাসিক এলাকা, ৩০টি বস্তি এলাকা, একটি বাজার, পাঁচটি উচ্চ বিদ্যালয়, আটটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৫টি কিন্ডারগার্টেন ও করপোরেশন পরিচালিত একটি পাঠশালা এবং প্রায় ৫৩টি মসজিদ, একটি মন্দির, করপোরেশনের তালিকাভুক্ত ১৭টি ও ২২টি তালিকা-বহির্ভূত ফোরকানিয়া মাদ্রাসা নিয়ে উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ড।
সরেজমিন ও তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ওয়ার্ডের অসংখ্য সমস্যার কথা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি এসব তুলে ধরেন এলাকার বাসিন্দারা।
জলাবদ্ধতা
বিগত ২০ বছর ধরে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আর জলাবদ্ধতাকেই প্রধান সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছে এলাকার বাসিন্দারা। বর্ষার শুরু থেকেই শেষ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা অনেক সময় দুই-তিন দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এ সময় স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ভীষণ ব্যাঘাত ঘটে। যানজট আর জনজট অতিষ্ঠ করে তোলে স্থানীয় জনসাধারণকে। উত্তর আগ্রাবাদের জলাবদ্ধাতার প্রধান কারণ মহেশখাল ভরাট। এক সময় এ খালের প্রস্থ ১২০ এবং গভীরতা ছিল ২০ ফুট। বর্তমানে এর প্রস্থ ৪০ এবং গভীরতা মাত্র ২ ফুট। এ খালের সঙ্গে উত্তর আগ্রাবাদ ছাড়াও ১২ নাম্ব^ার সরাইপাড়া, ২৫ নাম্বার রামপুর, ২৭ নাম্বার দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডসহ আরো ৪-৫টি ওয়ার্ডের পানি প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ে; কিন্তু খালের বর্তমান অবস্থার জন্য বর্ষকালে পানি দ্রুত প্রবাহিত হতে পারে না বলে জলাবদ্ধতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ খাল পলিমাটি আর পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালুতে ভরাট হয়ে গেছে। অন্যদিকে ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে এর দুপাড়ের বিশাল জায়গা। এরপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ফসিউল আলম।
অন্যদিকে উল্লিখিত ওয়ার্ডগুলো থেকে প্রবাহিত হয়ে পানির সঙ্গে আসা পাহাড়ি বালুতে ভরাট হয়ে যায় সব নালা-নর্দমা।
এছাড়া অপরিকল্পিত বাড়ি-ঘর নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব, নালা-নর্দমায় ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ, পানওয়ালাপাড়া, মুহুরীপাড়া, শান্তিবাগ, গুলবাগ, দাইয়াপাড়া, হাজিপাড়া, রঙ্গীপাড়া, মোল্লাপাড়ার নালা-নর্দমা দখল করে ইমারত ও দোকান নির্মাণ এবং নালার ওপর বড় বড় স্লেব দেওয়ার কারণে বছরের পর বছর বেড়ে চলেছে জলাবদ্ধতা। প্রতি বছরের এ জলাবদ্ধতাকে অভিশাপ বলেই অভিহিত করছে স্থানীয়রা।
বিশুদ্ধ পানির অভাব
এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সমস্যা প্রকট। সপ্তাহের একদিন ঘণ্টাখানেকের জন্য পানির দেখা মিললেও পুরো সপ্তাহে পানি পাওয়া যায় না। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ায় এলাকার অসংখ্য টিউবওয়েল ও ডিপ টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়েছে। পানি সমস্যার কারণে স্থানীয় জনসাধারণকে সর্বদা পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ।
ডাস্টবিন স্বল্পতা
পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই। যা আছে তা জনসংখ্যা অনুপাতে কম। ফলে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকার কারণে স্থানীয়রা যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলছে প্রতিনিয়ত। নিয়মানুযায়ী রাতের বেলা সিটি করপোরেশনের গাড়ি আবর্জনা সরিয়ে নিলেও ডাস্টবিন স্বল্পতার কারণে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় নতুন পাকা বাড়ি নির্মাণ করার কারণে পূর্বের ডাস্টবিনগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এ কারণে সড়কের পাশে ও নালা-নর্দমায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এভাবে জমে থাকা আবর্জনা থেকে সর্বদা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এজন্য পরিবেশ দূষণ ও জনগণের স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থা নিরসনে ওয়ার্ডের বিভিন্ন পয়েন্টে কন্টেইনার ডাস্টবিন ও স্থায়ী ডাস্টবিন নির্মাণের কথা ভাবছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মাদক ব্যবসা
এক বছর পূর্বেও মাদকের রমরমা ব্যবসা আর বখাটেদের উৎপাত ছিল চোখে পড়ার মতো। ওয়ার্ডের মিস্ত্রীপাড়া, মোল্লাপাড়া, রঙ্গীপাড়া, মনসুরাবাদ, পানওয়ালা পাড়ায় মাদকের বিকিকিনি চলতো প্রকাশ্যে। ফলে অসংখ্য তরুণ ও যুবক ঝুঁকে পড়ে এ মরণ নেশার দিকে। প্রায় সময় মাদক বিক্রির টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ হতো মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী এবং স্থানীয়দের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের ফলে তা ৫০ ভাগ কমে এলেও গোপনে অব্যাহত রয়েছে এ ব্যবসা।
যানজট
বর্ষা মৌসুম ছাড়া ওয়ার্ডের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যানজট কম হলেও প্রতিদিন চৌমুহনী মোড় থেকে দেওয়ানহাট মোড় পর্যন্ত একাধিকবার যানজটের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ঢাকা ট্রাংক রোড ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে সৃষ্ট যানজটের প্রভাব পড়ে ছোট সড়কগুলোতে।
সংস্কারবিহীন সড়ক
দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে ছোট-বড় সড়কগুলো যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বিটুমিন আর পাথর উঠে গিয়ে স্থানে স্থানে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। এতে যানবাহন চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টির পাশাপাশি পথচারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রঙ্গীপাড়া, মিস্ত্রীপাড়া এলাকা এবং গুলবাগ থেকে মুহুরীপাড়া পর্যন্ত হালিশহর সড়কের মৌলভীপাড়া, হাজিপাড়া, পানওয়ালাপাড়া এলাকায় সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়া বসুন্ধরা, সোনালী, শ্যামলী, শান্তিবাগ, রমনাসহ আবাসিক এলাকাগুলোতে নতুন সড়ক নির্মাণ ও সড়ক সংস্কার না করায় এসব এলাকায় বাসিন্দাদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
কলেজবিহীন ওয়ার্ড
নগরীর অসংখ্য ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছাড়াও রয়েছে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি কলেজ। কিন্তু অধিক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোন কলেজ নেই। মোল্লাপাড়া নিরিবিলি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা কলেজগামী ছাত্রী ছালমা খাতুন বলেন, এলাকায় শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে সরকারি-বেসরকারি যেকোন উদ্যোগে এ ওয়ার্ডে কলেজ নির্মাণ আবশ্যক।
চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত এলাকাবাসী
তিন লাখ ৫০ হাজার জনসংখ্যার জন্য সিটি করপোরেশনের চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে মাত্র একটি। এছাড়া মমতাসহ এনজিওর ক্লিনিক রয়েছে দুটি। এ অবস্থায় প্রতিনিয়ত চিকিৎসাসেবা-বঞ্চিত হচ্ছে এলাকাবাসী। এছাড়া এলাকায় নেই কোনো মাতৃসদন। ফলে মা ও শিশু মৃত্যুরোধ এবং তাদের সূচিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে মাতৃসদন ও পর্যাপ্ত চিকিৎসকের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শান্তিবাগ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক খাদিজাতুল কোবরা।
ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের বক্তব্য
ওয়ার্ড কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু (সংরক্ষিত ওয়ার্ড ৯) ও জাবেদ নজরুল ইসলামের সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ করা হলে উভয়ই ওয়ার্ডের বিরাজমান অধিকাংশ সমস্যার ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। তারা এ সমস্যাগুলো সমাধানে নিজ নিজ বক্তব্য তুলে ধরেন।
সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ ও আন্তরিকতার সঙ্গে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ওয়ার্ডের সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব বলে উল্লেখ করেন অ্যাডভোকেট রানু। তিনি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, যেকোনো সমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধিকে আন্তরিক, জনগণকে সচেতন এবং প্রশাসনকে অবশ্যই সততার মাধ্যমে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
জাবেদ নজরুল ইসলাম এলাকার জলাবদ্ধতা, যানজট ও মাদক ব্যবসাসহ অধিকাংশ সমস্যা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
তিনি যেকোনো আইন ও সমাজ বিরোধ কর্মকাণ্ড এবং ভেজালসহ সকল অনিয়ম বন্ধে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার প্রদান করা হলে বিরাজমান সমস্যা দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে বলে জানান।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন