প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে উপকূলের ২০ লাখ মানুষ
মোহাম্মদ রফিক
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন উপকূলের প্রায় ২০ লাখ মানুষ। এসব এলাকায় এখনো গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ ও দরিদ্র জনসাধারণকে সহায়তার লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচিরও বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন সময়ে তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও দুর্যোগ মোকাবিলার এসব কর্মপরিকল্পনা শুধু কাগজ-কলমে আটকে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে কালবৈশাখী ও নিম্নচাপের আশঙ্কার কথা জানা গেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে। মার্চ-এপ্রিলে দেশের ওপর দিয়ে মাঝারি ও তীব্র ঝড় বয়ে যেতে পারে। বঙ্গোপসাগরে চলতি মাসে একটি, এপ্রিলে দুটিসহ মোট তিনটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে এপ্রিলে একটি নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। সেই সঙ্গে বাড়বে দিনের তাপমাত্রাও। বৃষ্টিপাত হবে স্বাভাবিকের তুলনায় কম।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মহানগরসহ জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় এখনো প্রায় ২০ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা কম। সূত্রমতে, নগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে ৪৭৯টি। এর মধ্যে নগরে রয়েছে ৭২টি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল মালেক জানিয়েছেন, সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে ৭ মার্চ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোখলেছুর রহমান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, ‘বর্তমানে ৪৭৯টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে চার লাখ ৫২ হাজার ৮৮০ জনকে আশ্রয় দেওয়া যাবে। নগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় আরও ২০১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’
উপকূলীয় যেসব এলাকায় আরও ২০১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে এর মধ্যে সন্দ্বীপে ৯০টি, বাঁশখালীতে ২৪টি, আনোয়ারায় ১৮টি, সীতাকুণ্ডে ৩০টি, পটিয়ায় ১৫টি, মিরসরাইয়ে ২৪টি, পটিয়ায় ১৫টি ও নগরে ৩০টি। নাম প্রকাশ না করে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি শুধু কাগজ-কলমে রয়ে গেছে।’ তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল মালেক। তিনি বলেন, ‘দুর্যোগের পরে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর জন্য চাল-ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।’ ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা প্রণীত নাগরিক অধিকার অনুযায়ী, দুর্যোগজনিত ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচির আওতায় সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার মাধ্যমে দুস্থ ও দরিদ্র জনসাধারণের টেকসই আয় উত্পাদনমূলক কর্মবিনিয়োগ নিশ্চিত করার কথা থাকলে তা-ও রয়ে গেছে কাগজ-কলমে।
সূত্রমতে, ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও বিজলীতে জেলার বাঁশখালী, মিরসরাই, সন্দ্বীপ, আনোয়ারা ও সীতাকুণ্ডের প্রায় এক লাখ মানুষের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সময় ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচির আওতায় একটি পরিবারকেও সুদমুক্ত ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়নি। বর্তমানে দুর্যোগজনিত ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচির কার্যক্রম না থাকার কথা স্বীকার করে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, ‘জোট সরকারের আমলে এই প্রকল্পের কাজ চালু ছিল। বর্তমানে তা নেই। তবে আমরা পুনরায় এই কার্যক্রম শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে।’ সূত্রমতে, বর্তমানে বাঁশখালীতে ১১৭, সন্দ্বীপে ৬২, আনোয়ারায় ৫৮, সীতাকুণ্ডে ৫৯, পটিয়ায় ১৩, মিরসরাইতে ৭৫, বোয়ালখালীতে ৮, চন্দনাইশে ৫, সাতকানিয়ায় ৩, রাঙ্গুনিয়ায় ৩, রাউজানে ২ এবং নগরের ৭২টিসহ মোট ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্র আরও জানায়, বিগত জোট সরকারের আমলে সন্দ্বীপে ১৮০টি, বাঁশখালীতে ২২০টি, আনোয়ারায় ৪৫টি, সীতাকুণ্ডে ৬৫টি, মিরসরাইয়ে ৫৫টি, নগরে ৭০টি, পটিয়ায় ৩০টিসহ মোট ৬৬৫টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহর ও উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা ২০ লাখ মানুষের জন্য অন্তত এক হাজার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা দরকার।’ সূত্রমতে, বাঁশখালীতে আট লাখ, মিরসরাইয়ে চার লাখ, সন্দ্বীপ আড়াই লাখ, নগরে তিন লাখ, সীতাকুণ্ডে দেড় লাখ, আনোয়ারায় এক লাখ মানুষ দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। পতেঙ্গা লালদিয়ারচরের বাসিন্দা মো. ফরিদ উদ্দীন বলেন, ‘বৈশাখ আসার আগেই বুক কেঁপে ওঠে। সাগরে মাছধরা আমার পেশা। কোনো রকমে সংসার চলে। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলে এক কিলোমিটার দূরে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবার নিয়ে চলে যাই। আরও কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র এই এলাকায় হলে ভালো হতো।’
এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি মাসে দেশের উত্তর ও মধ্য অঞ্চলে দু-তিন দিন, একইভাবে এপ্রিল মাসে পাঁচ-সাত দিন মাঝারি বা তীব্র কালবৈশাখী এবং দেশের অন্যত্র চার-ছয়টি (এপ্রিলে) হালকা-মাঝারি কালবৈশাখী বা বজ্রঝড় হতে পারে। এ ছাড়া মার্চ-এপ্রিলে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে দু-তিনটি মাঝারি তাপ প্রবাহ (৩৮-৪০ ডিগ্রি) এবং দেশের অন্যত্র দু-তিনটি মৃদু তাপপ্রবাহ (৩৬-৩৮ ডিগ্রি) বয়ে যেতে পারে। এপ্রিলে বঙ্গোপসাগরে দুটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণকেন্দ্রের উপপরিচালক শাহ আলম এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে এ মাসেই একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন