বৃহস্পতিবার, ১১ মার্চ, ২০১০

ইনানী সৈকতে অবৈধ স্থাপনা

ইনানী সৈকতে অবৈধ স্থাপনা

উখিয়া উপজেলার ‘পাথুরে সৈকত’ নামে পরিচিত অপরূপ ইনানী সৈকত দখল করে নানা স্থাপনা তৈরির হিড়িক পড়েছে। অনেকে হোটেল-মোটেল তৈরির জন্য সৈকতের বালুচর দখল করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখছেন। আবার কেউ জমি দখলের জন্য সৈকতের সবুজ ঝাউবাগান উজাড় করছেন। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনে (১৯৯৫) সৈকতের এসব এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এখানে কোনো ধরনের অবকাঠামো তৈরি, জমির পরিবর্তন, বেচাকেনা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, বন্যপ্রাণী নিধন ও শামুক ঝিনুক আহরণ, পরিবহন, সরবরাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরো এক কিলোমিটারের সৈকতটি ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর। মেরিন ড্রাইভ সড়ক থেকে ইনানী সৈকতে ঢোকার সময় নজরে পড়ে ঝুপড়িঘর। বন বিশ্রামাগারের সামনে, সৈকতে নামার সামনের পথে, কাঠের সাঁকোর পাশে, সৈকতের বালুচরে ঝুপড়িঘর (দোকান) তুলে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসা চালাচ্ছেন। অনেকে ফেরি করে ডাব, তরমুজ, চা-বিস্কুট, ডিম, চটপটি, চিপস, খনিজ পানির বোতল বিক্রি করছেন। বিশেষ করে ডাবের খোসাসহ নানা ময়লা আবর্জনায় পুরো সৈকতটি হতশ্রী হলেও পরিষ্কারের কোনো ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নেই। সৈকতে নামার সময় কিছু তরুণ পর্যটকদের কাছ থেকে মাথাপিছু তিন টাকা হারে সাঁকো পারাপারের জন্য চাঁদা আদায় করেন। আর প্রতিটি গাড়ি থেকে ৪০-৮০ টাকা পর্যন্ত পার্কিং চার্জ আদায় করছেন ওই তরুণেরা। অথচ সেখানে পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। বন বিশ্রামাগারের সামনে ছোট্ট বালুচরে এবং নির্মীয়মাণ মেরিন ড্রাইভ সড়কের ওপর এলোমেলোভাবে গাড়ি রাখা হয়। এতে নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়রা জানান, উখিয়া বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব মহিলা কলেজের প্রভাষক নুরুল আমিন ওরফে ভুট্টু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ইনানী সৈকতটি ইজারা নিয়েছেন। তাঁর পক্ষ থেকেই পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত দুই তরুণ প্রায় সময় পর্যটকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাঁদের গালমন্দ শুনতে হয়।
নাম জানাতে অনিচ্ছুক এক তরুণ জানান, এনআর এন্টারপ্রাইজের মালিক ‘প্রফেসর ভুট্টু’ (নুরুল আমিন) টাকার বিনিময়ে সৈকতে অবৈধ দোকান নির্মাণে সহযোগিতা করেন। ভুট্টু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সৈকতে নামার জন্য কাঠের সাঁকো পারাপারে মাথাপিছু রসিদমূলে তিন টাকা ইজারা আদায় করা হয়। পার্কিংয়ের জন্য গাড়িপ্রতি আদায় করা হয় ৪০ টাকা।’
সৈকতের বন বিশ্রামাগারের দক্ষিণ পাশে গড়ে তোলা হয়েছে একটি আধুনিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ। হোটেল কর্তৃপক্ষ সৈকতে নামার জন্য বালুচরে বানিয়েছে একটি লোহার সাঁকো। আবার হোটেলের দক্ষিণ পাশে বিশাল বালিয়াড়ি দখল করে স্থায়ী সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছে টিকে গ্রুপ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের ভূমি কার্যালয়ের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সরকারি জমিতে সীমানাপ্রাচীর তৈরি বন্ধ করে দিলেও কয়েকদিন পর আবার তাঁরা নির্মাণকাজ শুরু করেন। তাঁরা সৈকতের মধ্যভাগে পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি খালের মাঝপথে আড়াআড়ি ভাবে পাকা দেয়াল তুলে পানি চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। এ ব্যাপারে টিকে গ্রুপ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন জানান, কাগজমূলে জমিটি স্থানীয় লোকজন থেকে কেনা হয়েছে। এখন ওই জমিতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ব্যাপারে তিনি সরকারিভাবে কোনো বিজ্ঞপ্তি পাননি। কেউ কাজে বাধাও দেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলামুর রহমান জানান, সরকারি জমি দখল করেই টিকে গ্রুপ সীমানাপ্রাচীর তৈরি করছে। এসব নির্মাণকাজ বন্ধ করার জন্য স্থানীয় ভূমি কার্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে ইনানী হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত নির্মীয়মাণ মেরিন ড্রাইভ সড়কের পশ্চিম পাশে সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। সমপ্রতি সরকারের পর্যটন মন্ত্রণালয় ইনানী সৈকতে ‘বিশেষ পর্যটনপল্লি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। জেলা প্রশাসন ওই এলাকায় কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও জমি বেচাবিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু প্রশাসনের বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে একশ্রেণীর ভূমিগ্রাসীচক্র সৈকতের জমি দখল করে তাতে স্থায়ী দেয়াল ও কাঁটাতারের ঘেরা দিচ্ছে। অনেকে জমি দখলের জন্য ইট, বালু, সিমেন্ট, রড প্রভৃতি নির্মাণসামগ্রী মজুদ করে রেখেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে ভুয়া কাগজমূলে সৈকতের জমি বিক্রি করে অবৈধ সুবিধা আদায় করছেন। আর ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সৈকতের জমি দখল করতে গিয়ে সাবাড় করছেন সবুজ ঝাউবাগানসহ বালিয়াড়ি। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
জেলা প্রশাসক মো. গিয়াস উদ্দিন আহমদ জানান, ‘সৈকতের জমি দখল করে স্থাপনা তৈরির অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। যাঁরা সৈকত দখল করে রেখেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিগগির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন