চট্টগ্রামে ভাড়াটিয়াদের বিড়ম্বনার শেষ নেই
স্বপন মল্লিক
নগরীর একশ্রেণীর বাড়িওয়ালা প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে আদায় করে যাচ্ছে ইচ্ছামতো বাড়িভাড়া। এতে করে ভাড়াটিয়া আর বাড়িওয়ালাদের মধ্যে মতবিরোধ লেগেই আছে। ফলে এ মতবিরোধের জের ধরে নিরুপায় হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত তথা নিগৃহীত পক্ষ ভাড়াটিয়ারাই মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া দাবির যন্ত্রণা থেকে রক্ষার জন্যই আইনের আশ্রয় নিচ্ছে সংখ্যায় বেশি।
খবর নিয়ে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগীর ১২টি থানা এলাকার ঘরভাড়া সংক্রান্ত মামলা দায়ের করতে হয় প্রথম সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, দ্বিতীয় সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, তৃতীয় সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ও পঞ্চম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে।
জানা গেছে, বিগত ২০০৯ সালে উল্লেখিত চারটি আদালতের শুধু একটিতেই দায়ের করা হয়েছে প্রায় শতাধিক অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগে মামলা। এ সময়ে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১০৬ ধারা মতে বাড়িওয়ালা কর্তৃক দায়ের হয় সর্বমোট মাত্র তিনটি মামলা। চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ভাড়াটিয়াদের দায়েরকৃত মামলার মাসওয়ারি এক হিসাবে দেখা গেছেÑ জানুয়ারিতে ১৯টি, ফেব্রুয়ারিতে একটি, মার্চে ১২টি, এপ্র্রিল তিনটি, মে মাসে তিনটি, জুনে চারটি, জুলাইয়ে দুটি, আগস্টে ১৯টি, সেপ্টেম্বরে ১০টি, অক্টোবর মাদেুধুটি, নভেম্বরে দুটি ও ডিসেম্বরে কোর্ট বন্ধের ফাঁকেও একটি মামলা দায়ের করা হয়।
চট্টগ্রাম মহাগরীতে প্রায় নব্বই শতাংশেরও বেশি লোকের বাস ভাড়াবাড়িতে। দিন দিন বাড়ছে এ সংখ্যা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল এমন অঞ্চলের অধিকাংশই লোক ছুটছে শহর পানে। মানুষের ক্রমবর্ধমান শহরমুখী প্রবণতার সঙ্গে সমানতালে বাড়ছে ভাড়াবাড়ির চাহিদা।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১০(ক) ধারায় বলা হয়েছেÑ বাড়ির মালিক অগ্রিম হিসেবে মাত্র এক মাসের ভাড়া নেবেন। একই আইনের ১৬ (১) ধারা অনুযায়ী এই ভাড়া বাড়িওয়ালা রসিদমূলে নিতে বাধ্য। রসিদে এও উল্লেখ থাকতে হবে, ভাড়াটিয়ার মাসিক ভাড়া এবং বিভিন্ন সেবা বিল আলাদা আলাদাভাবে নেয়া হচ্ছে। পরনো ভাড়াটিয়ার ভাড়া বৃদ্ধি সম্পর্কে ১৬(২) ধারায় বলা হয়েছে উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে প্রতি তিন বছর পর ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা যাবে। কিন্তু পদে পদে লঙ্ঘন করা হচ্ছে সে আইন। স্বল্পসংখ্যক বাড়িওয়ালাই আছেন যারা কমপক্ষে এক বা দুই মাসের ভাড়া অগ্রিম গ্রহণ করেন।
কিন্তু চলমান প্রেক্ষাপটে তিনের অধিক মাসের ভাড়া অগ্রিম নেয়া নিয়ম হয়ে গেছে। অগ্রিম কর্তনের ক্ষেত্রেও সুবিধাভোগী বাড়ির মালিক। মানা হয় না সুনির্দিষ্ট নীতি। কর্তন শর্ত বাড়ির মালিকই নির্ধারণ করে দেন। ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাড়ির মালিকের। গ্রতি তিন বছরে একবার নয়, ভাড়া বাড়ানোর সময়টিও তার মর্জিমতো। ভাড়ার রশিদ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রায় সব মালিকই একই নিয়ম মেনে চলেন। প্রকৃত ভাড়া অপেক্ষা রসিদে কম লিখেন। এটি তারা করেন আয়কর ফাঁকি দিতে। প্রায় নিরানব্বই শতাংশ বাড়ি মালিকই তা অনুসরণ করেন।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে আলাপ করা হয়েছে কয়েকজন বাড়িওয়ালার সঙ্গে। তাদের একজন আগে থেকে আইনটি সম্পর্কে অবহিত অন্যরা এ প্রথম জানতে পেয়েছেন। সবারই অভিমত, আইনটি পরিবর্তন দরকার। প্রতি তিন বছর পর ভাড়া বাড়ানোর আইন মেনে চলা সম্ভব নয়। সবকিছুর দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এ মূূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাড়িওয়ালার ওপরও পড়ছে।
আইনটি সম্পর্কে অনেক ভাড়াটিয়ার অভিমত জানতে চাইলে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে বলেন, যেখানে বাসা পাওয়াই সমস্যা। সেখানে আইন নিয়ে মাথা ঘামানো যায় না। বাড়িওয়ালার সাথে দরাদরি করে যত টা সম্ভব সুবিধা আদায় করার পক্ষে তিনি।
অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, নগরমুখী মানুষের স্রোত রোধ করা না গেলে যত কঠোর আইনই করা হোক, তা দিয়ে ভাড়াটিয়ার দুর্দশা লাঘব করা যাবে না। চাহিদার তুৃলনায় বাসস্থান সংখ্যা কম। বাসাভাড়া নিতে আগ্রহী লোকটিই বরং চাইবে মালিকের সাথে আলাপ আলোচনা করে একটি সমঝোতাতে পৌঁছাতে।
নগরমুখী জনস্রোত রোধ করতে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার উন্নয়নের দিকে। কেবল গ্রাম বা উঁচু স্তরের লোক নয়, সিটির বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের ভিআইপি, সিআইপি তথা অবস্থাপন্ন লোকও নিজেদের স্থায়ী বাসস্থান শহরের উন্নত সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ ওয়ার্ডে রাখতেই আগ্রহী।
অনেক পরিবার আছে, সন্তানকে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াতেই তারা বাসা ভাড়া নিয়েছেন। অনেকেই গ্রাম ছেড়েছেন শুধু জান মালের নিরাপত্তার জন্যই।
তথ্যাভিজ্ঞ মহলের অভিমত শিক্ষা, নিরাপত্তা, যাতায়াত এ তিনটি সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে কোনো লোকই নিজ এলাকা ছাড়তেন না ।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন