বৃহস্পতিবার, ১১ মার্চ, ২০১০

মহাজনের কাছে জিম্মি উখিয়ার জুমচাষিরা

মহাজনের কাছে জিম্মি উখিয়ার জুমচাষিরা
রতন কান্তি দে

উখিয়ার চাকমা আদিবাসীরা অনেক কষ্টে রোদে পুড়ে পাহাড়ি জমিতে জুমচাষ করেন। কিন্তু তাঁদের ফসল ও সবজি বিক্রির চার ভাগের তিন ভাগ টাকাই দিতে হয় দাদন ব্যবসায়ীদের। শুধু তা-ই নয় সুদের টাকা না দিলে মহাজনেরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। জমিও কেড়ে নেয়। ভুক্তভোগী চাকমারা এসব ভোগান্তির কথা জানান।
সরেজমিনে জানা যায়, পালংখালী ইউনিয়নের তেলখোলা, পার্শ্ববর্তী মুছারখোলা ও জালিয়াপালং ইউনিয়নের মনখালী, মাদাবানিরা গ্রামের প্রায় ৫০০ জুমচাষি দাদন ব্যবসায়ী-মহাজনদের কাছে জিম্মি।
মুছারখোলার পাদিকুমার চাকমা (৫৭) ও রাজু চাকমা (৫২) জানান, তাঁরা অনেক হাড়িভাঙা পরিশ্রম করে পাহাড়ে জুমচাষ করেন। জুমচাষ থেকে পাওয়া সেই ফসল বিক্রি করে যা পান তার বেশির ভাগই দাদন ব্যবসায়ীরা নিয়ে যান। মাদারবানিয়ার সজল চাকমা (৪৫) ও মনখালীর মুমবাউচা চাকমা জানান, মাথারঘাম পায়ে ফেলে জুম করছি। অথচ এত কষ্টের কোনো সুফল নিজেরা ভোগ করতে পারি না। প্রায় সবই দাদন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যায়।
এসব গ্রামের ভুক্তভোগী চাকমারা আরও জানান, স্থানীয় ১৫-২০ জন মহাজনের কাছ থেকে প্রতি বছর জুমচাষ শুরুর অন্তত মাস দেড়েক আগে জমির প্রস্তুতি নিতে চড়াসুদে টাকা নেন। টাকা দেওয়ার সময় মহাজনেরা তাঁদের কাছ থেকে দেড় শ টাকার খালি স্টাম্পে সই নেন। সুদের টাকা নিয়ে তাঁরা পাহাড়ে ধান, মরিচ, বেগুন, মাসকলাই, ভুট্টাসহ বিভিন্ন জাতের ফসল ও সবজির আবাদ করেন। চার-পাঁচ মাস পর বিশেষ করে ভাদ্রে মহাজনদের আসলসহ দ্বিগুণ থেকে চারগুণ সুদ পরিশোধ করতে হয়। তাঁরা এই চার-পাঁচ মাসের জন্য ১০, ১৫, ২০, ২৫ হাজার টাকা নেন।
তেলঘোনার স্থানীয় হেডম্যান লাইক্য চাকমা, সবুচিং মাস্টার ও মুছারঘোনার কার্বারি সবিন্ন চাকমা জানান, দুই গ্রামে তোফাইল আহামদ, ছৈয়দ মিয়া, জাফর আহমেদ, শামশুল আলম, রহিম উদ্দিন, কামাল উদ্দিন, নূর আলম এবং মাদারবনিয়ার হেডম্যান চিংতং চাকমা ও মনকালীর চাকমাদের সমাজ সর্দার রইচাইন চাকমা বলেন, তাঁদের গ্রামের দুদুমিয়া, মিরাজান শফিক আহামদ, কাদের হোছন, নুরু বলী, খোরশেদ আলম, আব্দুল গফুর, আবুল হোসেন, আবুল কাশেম, জানে আলম, বক্তার আহামদ চৈত্রের শেষদিক থেকে বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে চাকমাদের সুদে ২০-২৫ লাখ টাকা দেন। সুদের টাকা দিতে না পারলে তাঁরা জমি কেড়ে নেন।
উল্লিখিত মহাজনেরা জানান, চাকমারা তাঁদের কাছ থেকে চুক্তি করে সুদে টাকা নেন। তিন-চারগুণ সুদ নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তাঁরা জানান, ওই নিয়ম ১৫-২০ বছর ধরে চলে আসছে। টাকা দিতে না পারলে তাঁরা চাকমাদের জমিও দখল করে নেন। পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাযহারুল আনোয়ার চৌধুরী সীফাত ও জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চৌধুরী বলেন, স্থানীয় ২০-২৫ মহাজনের চক্র সহজ সরল চাকমাদের নীরবে শোষণ করছে। প্রতিবছর জুমের শেষে পরিষদে জমি ও টাকাসংক্রান্ত বিষয়ে পাঁচ-ছয়টি করে বিচার সালিস সমাধান করতে হয়। চাকমাদের বিষয়টি মানবিক। তাঁদের ঘামের ফসল অধিকাংশই ঘরে নিতে পারেন না।
লিটন চাকমা, মংকিউ চাকমা বলেন, কোনো সরকারি বা বেসরকারি এনজিও সংস্থা ধান প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জুমচাষের সময় সহজ শর্তে ধান দিলে তাঁদের উপকার হতো। বিশেষ করে সরকারিভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁরা আর দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণের শিকার হতেন না।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতি বছর জুমচাষের শেষে চাকমাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ঘটনা নিয়ে মারামারি হয় এবং এসব ঘটনার ব্যাপারে অভিযোগও আসে। অনেক সময় ঘটনা জটিল আকার ধারণ করলে মামলাও রেকর্ড করতে হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহম্মদ গোলামুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমি আগে জানতাম না। যদি এরকম হয়ে থাকে তাহলে তো চাকমাদের ওপর সুদ ব্যবসায়ী মহাজনেরা জুলুম করছে। বিভিন্ন ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমিতি করে চাকমাদের ধান পাওয়ার ব্যবস্থা করব। এ ছাড়া তদন্ত করে দাদন ব্যবসায়ী মহাজনদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজালাল চৌধুরী বলেন, উপজাতীয়দের ওপর মহাজনদের অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতন ও সুদের ব্যবসার বিরুদ্ধে উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন