মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাঁটি ছিল পাঠানটুলীর বড়ণ্ডয়া পাড়া
রিটন আহসান
পাঠানটুলী বড়ণ্ডয়া পাড়ার জয়মোহন বড়ণ্ডয়ার বাড়ির সামনে একটি মাদারগাছে (পারিজাত) বড়বড় হরফে লেখা ছিল “চাইনিজপন্থী বুড্ডিস্ট”। এটি আমাদের নিরাপত্তা বেষ্টনি হিসেবে কাজ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। বড়ণ্ডয়া সম্প্রদায়ের লোকজন এই সাইনবোর্ডটির কারণে একদিকে তারা যেমন নিরাপদে ছিল, অন্যদিকে আমরাও এখানে থেকে নানা অভিযান পরিচালনা করেছি কিছুটা স্বস্তিতে।
কথাগুলো বলছিলেন, আগ্রাবাদ আনন্দিপুর মুন্সিবাড়ির বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হারিস। মুক্তিযুদ্ধের সময় বড়ণ্ডয়া পাড়ার জয়মোহন বড়ণ্ডয়ার বাড়ির শাক্যপদ বড়ণ্ডয়ার বাসায় বড় একটি সময় কাটিয়েছিলেন মোহাম্মদ হারিস ও তার সহযোদ্ধারা।
মোহাম্মদ হারিসের সাথে আলাপ করে জানা যায়, সিডিএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাকারিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হন। এরপর তিনি তার জুনিয়র অফিসার ইঞ্জিনিয়ার মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমানকে জানান, তিনি যেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, মাঈনুদ্দিন খান বাদল এবং আমাকে দ্রুত চট্টগ্রাম ত্যাগ করতে বলেন। নয়তো পাকবাহিনী আমাদের বাঁচতে দেবে না।
আজিজুর রহমান এ বার্তা পেয়ে জুলাই মাসের শেষের দিকে আমাদের তিনজনকে নিয়ে যান পাঠানটুলী বড়ণ্ডয়াপাড়ার জয়মোহন বড়ণ্ডয়ার বাড়িতে। এখানে থেকেই আমরা দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের নানা অপারেশন চালাই। অপারেশন জ্যাকপটের সময়ও তারা এই বাড়িতেই ছিলেন।
জানা যায়, জয়মোহন বড়ণ্ডয়া ছিলেন জেমস ফিনলের কর্মকর্তা শাক্যপদ বড়ণ্ডয়ার ছাত্র। তিনি জয়মোহনদের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। পাশের বাসায় থাকতেন হৃদয় বড়ণ্ডয়া ঝন্টু এবং কল্পনা বড়ণ্ডয়া। এ সময় শাক্যপদর বাসায় কমিউনিস্ট পার্টি নেতা দেবেন সিকদার থাকতেন। রেলওয়ের আরো এক কর্মচারীও থাকতেন একই বাসায়। ইতোমধ্যে একদিন জয়মোহন শাক্যপদকে বলে তার বাসায় কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে আশ্রয় দিতে হবে। এ প্রস্তাব পেয়ে শাক্যপদ কমিউনিস্ট নেতা দেবেন সিকদার ও আশ্রয়ে থাকা অন্য পরিবারটিকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন।
তারপর তার বাসায় প্রথম দফায় আসেন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হারিস, হাজী পাড়ার মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন এবং বোয়ালখালীর মাঈনুদ্দিন খান বাদল বর্তমানে সংসদ সদস্য।
এ তিনজন নিয়মিতভাবে থাকতেন উক্ত বাড়িতে। তাছাড়াও আরো আসতেন মরহুম এসএম জামাল উদ্দিন, জিন্নাহসহ বিভিন্ন গ্রুপের কমাণ্ডররা।
আশ্রয়দাতা শাক্যপদ বড়ণ্ডয়া সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন, আমার বাসায় মুক্তিযোদ্ধারা থাকতেন। তবে যোদ্ধাদের খাবার তৈরির বিষয়টি দেখতেন পাশ্ববর্তী বাসার হৃদয় বড়ণ্ডয়া ও কল্পনা বড়ণ্ডয়া। তিনি বলেন, সেই কঠিন সময়ে কল্পনা আমাদের মায়ের কাজটি করেছিলেন।
যোদ্ধাদের নানাবিধ খরচাপাতির বিষয়ে সহযোগিতা করতেন জয়মোহন বড়ণ্ডয়া এবং হৃদয় বড়ণ্ডয়া ঝন্টু। ঝন্টু চাকরি করতেন ওয়াপদায়। তার বাড়ি ছিল বোয়ালখালীর আহল্লা গ্রামে। যুদ্ধের সময় বেশ দীর্ঘ সময় তিনি টাকা পাঠাতে পারেননি গ্রামের বাড়িতে বাবা-মার কাছে। ফলে বেতনের পুরো টাকাটাই খরচ করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে।
এ ব্যাপারে মোহাম্মদ হারিস জানান, ঝন্টু আর কল্পনার কাছে আমরা চিরকাল ঋণী হয়ে থাকলাম। তারা কখনোই আমাদের তাদের অভাব বুঝতে দেননি। একবার মোহাম্মদ জালাল কিছু চা পাতা এবং কনডেন্সড মিল্ক নিয়ে গেলে তারা খুবই মনক্ষুন্ন হন। তিনি জানান, সেই কঠিন সময়েও এতটা আন্তরিকতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে রীতিমত।
শাক্যপদ মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়কার অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সবকিছুই কেমন যেন সয়ে গিয়েছিল। তবে একবার রাতে পাঞ্জাবিরা বাড়ি আক্রমণ করবে বলে খবর পেয়ে বাড়ির সবাই কিছুটা আতংকিত হয়ে পড়ি। সবাই প্রস্তুতি নিই দা, ছুুরি, লাঠিসোটা, মরিচের গুড়ো ইত্যাদি দিয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত আক্রমণ হয়নি।
যোদ্ধাদের গতিবিধি এবং অস্ত্র সম্পর্কে ঝন্টু বলেন, তারা দিনের বেলায় বাইরে থাকতো রাত হলে বের হয়ে পড়তো। তবে কোথায় যেত কী করে আসতো তা ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি কখনো। তবে মাঝে মাঝে তাদের কোমরে পিস্তল দেখতাম।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন