
আগ্রাবাদের ওসমান কোর্ট ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনস্থল রিটন আহসান
আমরা চেয়েছিলাম সব ভাইবোন একইভাবে শিক্ষিত হবো। সবাই ভাগাভাগি করে আমাদের খাবার খাবো। কেউ অভুক্ত থাকবো না। অথচ আজ একশ্রেণীর ধনী ব্যক্তির একবেলার বিলাসিতার যে খরচ তার সিকি পরিমাণ টাকাও মাসোহারা হিসেবে পায় না এদেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ। আর কত মানুষ যে না খেয়ে দিনাতিপাত করে তার হিসেব কে রাখে। এই বাংলাদেশ আমরা চাইনি। ক্ষোভের সাথে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আগ্রাবাদ ওসমান গনি সওদাগরের পুত্র বিশিষ্ট লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ওসমান কোর্ট নামে পরিচিত ওসমান সওদাগরের একতলা ভবনটি ভবনটি ছিল শহরের অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার যোগাযোগের অন্যতম মিলনস্থল।
এই ভবনকে ঘিরে নানা ঘটনার বর্ণনা দেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার কয়েকমাস পর আগস্ট মাসের কোন একদিন সকালবেলা। ঠিক কোনদিন মনে তা সঠিকভাবে বলা মুষ্কিল। প্রচণ্ড রোদ ছিল সেদিন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মিলে পরিকল্পনা করছিলাম আমাদের একতলা এই ভবনটিতে। ভবনের চারদিকে ছিল গ্লাস লাগানো। চট্টগ্রামে সেই সময় এটিই ছিল একমাত্র গ্লাসযুক্ত ভবন। ভেতর থেকে সবকিছুই দেখা যায়। কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরের কোনকিছুই দেখা যায় না।
হঠাৎ দেখি পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর একটি গাড়ি এসে দরজার ঠিক সামনে রাখলো। ভেতর থেকে দেখে আমার তখন সারা শরীরে কাঁপন ধরে যায়। ইশারা করে ভেতরের সহযোদ্ধাদের যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বলি। তারপর নিজেকে যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে পাকবাহিনীর সাথে কথা বলতে গেলাম। সৈন্যদের কমাণ্ডার ছিল অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং কিছু সদালাপী। চেষ্টা করলাম তার সাথে ভাব জমাতে। আলাপচারিতার পর বুঝলাম তার উদ্দেশ্য এই বাড়ি নয় সে আসলে খুঁজছে ৭০ আগ্রাবাদ। এখানে উল্লেখ্য, এর কিছুুদিন আগে সরকারি নির্দেশ মোতাবেক বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি উর্দুতে লেখা হয় ৭০ আগ্রাবাদ। কিন্তু সাইনবোর্ড যিনি লিখেছেন তিনি ভুলক্রমে লিখেছিলেন ৮০। যে কারণে এই বিপত্তি ঘটেছিল। পরে অবশ্য সেই সেনা কর্মকর্তা আমাদের দেখিয়ে দেয়া ভবনের দিকে চলে যায়।
ওসমান কোর্টে যখন মিলিটারি আসে তখন মিন্টু (সম্প্রতি প্রয়াত) নামে এক যোদ্ধা গিয়েছিল বাজার করতে। বিষয়টি দেখে সে ওসমান কোর্টে না গিয়ে চলে যায় সোজা আমাদের বেপারিপাড়ার বাসায়। সে গিয়ে খবর দেয় আমাদের পাকবাহিনী ঘেরাও করেছে বলে। এরপর আমি তিনদিন বাড়ি যাইনি।
বাড়ির লোকজন এতটাই শংকিত ছিল যে, বাড়ি থেকে ওসমান কোর্টের দূরত্ব হাফ কিলোমিটারের বেশী না হলেও তারা ভয়ে খবর নেয়ার সাহস পায়নি। এরকম অসংখ্য ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাদের সবাইকে।
৭০ আগ্রাবাদ এলাকা এখন যেখানে এইচএসবিসি ব্যাংক অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই ভবনটি ছিল একতলা একটি বাড়ি।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ওসমান গনি সওদাগর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে নিজের অনেক কিছুই বিলিয়ে দিয়েছিলেন নিঃশর্তভাবে। এ সময় নরউইচ ইউনিয়ন এবং আমেরিকান লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে ৫০ হাজার টাকা করে দুটি ইন্সুরেন্স ছিল। মাত্র কয়েকটি মাস পার হলেই এসব ইন্সুরেন্সের মেয়াদ পূর্ণ হতো। কিন্তু এসময় ওসমান কোর্ট এবং নিজের বাড়িতে প্রতিদিন আগত অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার খাবার যোগানোর জন্য এ দুইটি ইন্সুরেন্স ভেঙে ফেলতে হয়। তাছাড়া পুত্রবধু শামসুন্নাহারের ৩২ ভরি স্বর্ণও বিক্রি করে দিতে হয় তাকে।
ওসমান কোর্টের অভ্যন্তরে রাখা হতো ছোটবড় অনেক অস্ত্র। এর মধ্যে ছিল অ্যাক্সপ্লোসিভ, গ্রেনেড, লিমপ্যাড মাইনসহ অপারেশন জ্যাকপটের অনেক সরঞ্জাম। নানারকমের জিনিষপত্রের কার্টনে করে এসব অস্ত্র নানা জায়গায় সরবরাহ করা হতো।
এই বাড়িটিতে বিভিন্ন সময়ে এসেছেন মৌলভী সৈয়দ আহম্মদ, ডা. মাহফুজুর রহমান, ডা. ইকবাল, ডা. মুলকুতুর রহমান, কাজী ইনামুল হক দানুসহ আরো অনেকে।
পাশাপাশি ওসমান সওদাগরের বাড়িতেও আসত অনেক মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের আসার কোন সঠিক সময় ছিল না। দিনের যে কোন সময় কয়েকজন একসাথে এসে আশ্রয় নিত। বাড়ির কাচারী ঘর থেকে শুরু করে সর্বত্র পড়ে থাকতো মুক্তিযোদ্ধারা। আর তাৎক্ষণিকভাবে ওসমান সওদাগরের মা আমেনা খাতুন লেগে যেতেন রান্নার কাজে। তাছাড়া ওসমান সওদাগরের মেয়ে আঞ্জুমান আরা এবং পুত্রবধু শামসুন্নাহার বাড়ির চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন এবং শত্রুপক্ষের আগমন টের পেলেই মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দিতেন কৌশলে। ক্ষণিকের জন্য আশ্রয়ই শুধু নয়, এই বাড়িটিতে বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে অনেককে। যার মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও রয়েছেন।
তথ্য সূত্র: সুপ্রভাত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন