মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০১০

চট্টগ্রামে বয়লার-কেপিপিতে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের গণনোটিশ

চট্টগ্রামে বয়লার-কেপিপিতে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের গণনোটিশ

সাইফুদ্দিন তুহিন


চট্টগ্রামে ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও গ্যাসের অভাবে চালু করতে না পারা প্রায় দেড়শ’ নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য কোন সুখবর তো নেই-ই বরং চালু প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ার হুমকির মুখে পড়েছে। বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেম লিমিটেডে (বিজিএসএল) গণনোটিশ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্যাপ্টিভ পাওয়ার পান্ট (কেপিপি) ও বয়লারে আর গ্যাস সরবরাহ দেয়া যাবে না। সহসাই তাদের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কেপিপি ও বয়লার চালু রাখতে গ্যাসের পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নোটিশ পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে শিল্প মালিকরা এ নোটিশ প্রত্যাহারের জন্য ষোলশহরে বিজিএসএলের আঞ্চলিক কার্যালয়ে ধরনা দিচ্ছেন। তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ না করে একতরফা নোটিশ প্রদান মেনে নেয়া যায় না। অনেকে নোটিশ পাঠানোকে চট্টগ্রামের শিল্প প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বিজিএসএলের কর্মকর্তারা জানান, পেট্রোবাংলার নির্দেশেই নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার শুরু না করলে শিল্প প্রতিষ্ঠানের কেপিপি ও বয়লারে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে বলে তারা জানিয়েছেন। কেপিপি মূলত গ্যাসভিত্তিক জেনারেটর। চট্টগ্রামের ছোট-বড় প্রায় ১ হাজারেরও বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে গার্মেন্টস আছে সাড়ে ৭শ’। ছোট আকারের কারখানায় ডিজেলনির্ভর জেনারেটর দিয়ে লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হয় না। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য কেপিপিই একমাত্র ভরসা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্যাটাগরির শিল্প প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ১৬৫টি কেপিপি ব্যবহার করা হয়। আর বয়লার (বাষ্প তৈরির বিশেষ মেশিন) চলে ১১০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে। শিল্প প্রতিষ্ঠানে স্টিম (বাষ্প) ব্যবহারের কাজে ব্যবহার হয় বয়লার। ওয়াটার টিউব ও ফায়ার টিউব দুই ধরনের বয়লার দিয়ে উৎপাদন করা হয় বাষ্প। দুই খাতেই অন্তত ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ডিজেল কিংবা ফার্নেস অয়েল দিয়ে এসব চালানো ব্যয়বহুল হওয়ায় দীর্ঘদিন থেকে গ্যাস দিয়ে চালানো হচ্ছে। তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন বিঘিœত হওয়া থেকে শিল্প প্রতিষ্ঠান রক্ষার জন্য কেপিপি ব্যবহার ছাড়া বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য জাহাজে বোঝাই করতে সময় নির্ধারণ করা থাকে। লোডশেডিংয়ের কারণে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে উৎপাদন করা যায় না। ফলে রফতানি অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি থেকেই যায়। মূলত ঝুঁকি এড়াতেই কেপিপির মাধ্যমে শিল্প কারখানায় উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা হয়। এখন তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পালা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ ঘাটতি। আর এ সময় শিল্প প্রতিষ্ঠানে কেপিপির ব্যবহারও বেড়ে গেছে। এখন হঠাৎ করে কেপিপি ও বয়লারে গ্যাস সংযোগ বন্ধের পরোক্ষ নির্দেশনা পাওয়ায় শিল্প মালিকরা কিংকর্তব্যবিমুঢ়। তারা বুঝে উঠতে পারছেন না কেন বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের নোটিশ দেয়া হচ্ছে। বিজিএসএল সূত্র জানায়, গত ফেব্র“য়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে কেপিপি ও বয়লার মালিকদের কাছে নোটিশ পাঠানো শুরু হয়। বিজিএসএলের বিক্রয় বিভাগের উত্তর ও দক্ষিণ পৃথক দুই জোন থেকেই নোটিশ যাচ্ছে। ইতিমধ্যে নোটিশ পাঠানো অর্ধেক শেষ হয়েছে। বাকি নোটিশগুলো পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশিষ্টরা। নোটিশে বলা হয়েছে, সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হ্রাস এবং গ্রিডলাইন থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাস সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে কেপিপি ও বয়লারে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। নোটিশে বিকল্প জ্বালানি কি তা উলেখ করা হয়নি। নোটিশে সরাসরি বলা না হলেও পরোক্ষভাবে ছয় মাস পর কেপিপি ও বয়লার থেকে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। নোটিশ দেয়ার কথা স্বীকার করে বিজিএসএলের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) খান আশরাফ আলী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, গ্যাস সাশ্রয় করতেই এ নোটিশ দেয়া হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে। ছয় মাসের মধ্যে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে চালাতে হবে কেপিপি ও বয়লার। অন্যথায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হতে পারে। এ ব্যাপারে বিজিএসএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (উত্তর) মতিউর রহমান বলেন, তীব্র গ্যাস সংকট এড়াতে নোটিশ দেয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। ছয় মাসের মধ্যে কেপিপি ও বয়লারে কি ধরনের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা যায়Ñ এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ফার্নেস অয়েল দিয়ে চালানো যেতে পারে। এদিকে কেপিপি ও বয়লারে গ্যাসের পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার সংক্রান্ত নোটিশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ব্যবসায়ীরা। প্রায় প্রতিদিন ষোলশহরে অবস্থিত বিজিএসএলের আঞ্চলিক কার্যালয়ে এসে ধরনা দিচ্ছেন নোটিশ পাওয়া কেপিপি মালিকরা। তারা বিজিএসএলের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছেন বিকল্প কি জ্বালানি ব্যবহার করা যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ নোটিশ গ্রহণযোগ্যতো নয়ই, অমানবিক। এতে রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ও সংসদ সদস্য এমএ লতিফ যুগান্তরকে বলেন, কেপিপি বা বয়লার থেকে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার যে কোন সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই নিতে হবে। হঠাৎ করে এরকম নোটিশ দেয়া যায় না। বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিবর্তে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার নোটিশ দেয়া হচ্ছে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। বিজিএসএলের উচিত গ্যাস সংযোগ বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করে অনাপত্তি পাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত সংযোগের ব্যবস্থা নেয়া। চট্টগ্রাম চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি এমএ ছালাম যুগান্তরকে বলেন, নোটিশ পেয়ে অবাক হয়েছি। আমার নিজেরও দুটি কেপিপি আছে। নোটিশে আসলে কি বলা হয়েছে জানতে চেয়ে কোন সদুত্তর পাইনি ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন