শনিবার, ৬ মার্চ, ২০১০

সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ কমছে

সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ কমছে

আলী হায়দার


মাছ ধরার আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও ফিশিং ভেসেলের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু দেশের গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ আনুপাতিকহারে ক্রমশ কমে আসছে। এর মধ্যে চিংড়ি আহরণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি কমছে। অথচ রপ্তানি বাজারে এই পণ্যটির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। গভীর সমুদ্রে দিন দিন মৎস্যসম্পদ কমে যাওয়ার ফলেই আহরণের হার কমছে।


১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ট্রলার প্রতি গভীর সমুদ্র থেকে গড়ে ২৬৮ মেট্রিক টনের বেশি মাছ ধরা সম্ভব হত। সেখানে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তা ট্রলার প্রতি প্রায় ৪১ টন কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২২৭ টনের কিছু বেশি। এদিকে এই একই সময়ে চিংড়ি আহরণের পরিমাণ কমেছে প্রায় ১ হাজার টন। ১৯৯৮-৯৯ সালে যেখানে গভীর সমুদ্র থেকে চিংড়ি আহরণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৬৪ টন সেখানে ২০০৮-০৯ সালে এর পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ টনের কিছু বেশি। বর্তমানে অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। অথচ এই ১০ বছরের ব্যবধানে উন্নত মানের যান্ত্রিক ট্রলারের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি মৎস্য আহরণ প্রযুক্তিও উন্নত হয়েছে।


এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ এর পরিচালক প্রফেসর ড. মুহম্মদ রাশেদুন্নবী সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, মৎস্য খাতের বাজেটে সমুদ্র এবং উপকুলীয় মৎস্য গবেষণার উপর বরাদ্দ মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। ফলে গবেষণা কিংবা জরিপ নেই সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের উপর। এছাড়া পরিবেশ দুষণ, ট্রলারের সংখ্যা বৃদ্ধি, ডাটা তৈরী এবং সংরক্ষণের অভাব এবং বিভিন্ন কায়দায় সামুদ্রিক মাছের পোনা ধরা ইত্যাদি কারণে মৎস্য সম্পদ কমে আসায় আহরণও কমছে।


জানা গেছে, দেশের গভীর সমুদ্রের মৎস্য সম্পদের পরিমাণ, বিভিন্ন ধরনের মাছের অবস্থা এবং তার প্রেক্ষিতে কী পরিমাণ ট্রলার ব্যবহার করে মৎস্য সম্পদ আহরণ করা সম্ভব সে সম্পর্কে কোন হাল নাগাদ জরিপ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কাছে নেই। সর্বশেষ ৯০ এর দশকের দিকে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের বিষয়ে একটি জরিপ হলেও গত দুই দশকে আর কোন জরিপ হয়নি। ফলে দেশের মৎস্য সম্পদের পরিমাণ কত এবং তার প্রেক্ষিতে কতটি ট্রলার দিয়ে মাছ ধরা উচিৎ তা কেউ জানেনা।


এ বিষয়ে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক ড. শরীফ আহমদ সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের সামগ্রিক বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ থাকা দরকার। কিন্তু গত ২ দশকে এ ধরনের কোন জরিপ না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র নেই। ফলে সমস্যা কী, সম্ভাবনাই বা কতটুকু তা আন্দাজ করা এবং সে প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে মৎস্য সম্পদ জরিপের একটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।


উল্লেখ্য, দেশের আহরিত মোট সামুদ্রিক মাছের শতকরা ৯৩ শতাংশ আহরিত হয় যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযানের মাধ্যমে। বাকি মাত্র ৭.২৬ শতাংশ মাছ যান্ত্রিক ট্রলারের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে আহরিত হয়। বঙ্গোপসাগরের মোট ১৭ হাজার ১৩৮ বর্গ কিলোমিটারের ৪টি মৎস্যক্ষেত্র থেকে এ মাছ সংগ্রহ করা হয়। এসব এলাকা থেকে বাকি মাছ সংগ্রহ করে যান্ত্রিক অযান্ত্রিক মিলে ৪৩ হাজার ১৩৬ টি নৌযান।


সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে জাতিসংঘের ফাও’এর উপদেষ্টা ও মৎস্য মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. কদর উদ্দিন সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, দেশের মৎস্য সম্পদ সম্পর্কে কোন প্রকৃত পরিসংখ্যান নেই। জরুরিভাবে এ বিষয়ে জরিপ কাজ সম্পন্ন করে দেশের প্রোটিনের চাহিদার এক উল্লেখযোগ্য অংশের যোগানদাতা সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ আহরণের বিষয়ে সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা নেয়া দরকার। অন্যথায় এক সময় এ সম্পদ বর্তমান মাত্রায় নাও পাওয়া যেতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন