বুধবার, ১০ মার্চ, ২০১০

দরিদ্র সখিনার ভাগ্য বদলায়নি এখনো


দরিদ্র সখিনার ভাগ্য বদলায়নি এখনো
রিটন আহসান


বাজি ট্যাঁয়া পইসে বেশি নোআছিল। নিজর আর্থিক অবস্থা আছিল খারাপ। তবুও যদ্দুর পাজ্জি তারারে খাবাই। ডঁর মাইনসর পোয়া তারা, যা রাধিঁ দিতাম তারা কন কথা ছাড়া এগিন খাই আবার কডে যাইতুগই। এন একখান ভাব গইত্ত যেন তারা নেয়ামত খার। (বাবা টাকা পয়সা বেশি ছিল না আমার। নিজের আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল। তবু যতদূর পেরেছি তাদের খাইয়েছি। ধনীলোকের ছেলে ছিল তারা, যা রেঁধে দিতাম তারা বিনা বাক্যে খেয়ে আবার কোথায় যেন চলে যেত। খাওয়ার সময় এমন একটা ভাব করতো যেন স্বর্গের খাবার খাচ্ছে)


এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আসকার দিঘীর দক্ষিণ পাড়র আলী ফকির বাড়ির মরহুম আবদুর রহমানের স্ত্রী সখিনা বেগম। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাড়িতে তিনি আগলে রেখেছিলেন অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। সন্তান স্নেহে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই সখিনা বেগমের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি একটুও। সেই যোদ্ধারাও খবর নেয়নি একদিনের জন্য। যে ঝুপড়িতে ছিলেন সেই ঝুপড়িতেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন সখিনা ও তার পরিবার। জানা যায়, আসকারদিঘীর দক্ষিণ পাড়ে থাকতেন আবদুর রহমান। পারিবারিক অবস্থা খুব বেশি ভাল ছিল না। বার্জার পেইন্টে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর একদিন তার শ্যালক মুক্তিযোদ্ধা সিকান্দর আলী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে তার বাড়িতে আশ্রয় নেন। বাড়ির চারপাশ ছিল নানা রকম ঝোপঝাড়ে পূর্ণ। বাড়ির পেছনে ছিল একটি ছোট রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে যোদ্ধারা দেয়াল টপকে বাড়িতে আসা যাওয়া করতেন।


সখিনা বেগম জানান, যোদ্ধারা সন্ধ্যার পরপর সন্তর্পনে বাড়িতে আসতো এবং গভীর রাতে তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত। কোথা থেকে আসত কোথায় বা যেত তার কোনকিছুই জানতেন না সখিনা বেগম।


সখিনা বেগমের অবস্থা আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে মুক্তিযোদ্ধারা বাড়িতে আসার সময় ছোট মাছের শুটকি, শুকনো মরিচ, ডিম ইত্যাদি নিয়ে আসতেন। তাছাড়া সামান্য কিছু টাকা নানাভাবে বাইরে থেকে যোগাড় করতেন যোদ্ধারা। সারাদিন কখনো ঘুমিয়ে কখনোবা নানারকম শলাপরামর্শ করে কাটাতেন। রাতে তাড়াহুড়ো করে কিছু খেয়ে আবার চলে যেতো।


যোদ্ধাদের রক্ষিত অস্ত্র সম্পর্কে সখিনা বেগম বলেন, বাজি বহুত রকমর বন্দুক, বোম আইনতো। বন্দুকর নাম ন জানি। আপেলর মত, সরিফার মত কনুও আবার কচ্ছপর মত দেইখতে। ডর লাইগত। (বাবারে, ওরা অনেক রকম বন্দুক, বোমা আনত। ওগুলোর নাম জানতাম না। আপেলের মত, সরিফার মত, কোনটা আবার কচ্ছপের মতো দেখতে। ভয় লাগতা)


সখিনা বেগমের মাত্র দুটো কক্ষ ছিল। তার একটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন। অন্যকক্ষে থাকতো মুক্তিযোদ্ধারা। বাড়ি থেকে বের হবার সময় যোদ্ধারা সখিনাকে বলতেন, খালা এসব জিনিষপত্রে হাত দিও না। ক্ষতি হতে পারে। তিনিও ভয়ে দেখার চেষ্টা করেননি কখনো।


সখিনা বেগমের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কারণে শত্রুপক্ষের দ্বারা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন না হলেও একদিন সন্ধ্যার পরপর একদল পুলিশ বাড়িতে অভিযান চালায়। বিষয়টি আগে থেকে আঁচ করতে পেরে যোদ্ধারা পেছনের রাস্তা দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর বেশকয়েকদিন তারা ঐ বাড়িতে যায়নি।


বিভিন্ন সময়ে এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন ডা. মাহবুব, ডা. জাফর, শহীদ রফিক, মরহুম কামরুল ইসলাম, মরহুম রবিউল হোসেন কচি, কাজী ইনামুল হক দানু, অরুণ দাশগুপ্ত সাথী, ফখরুল আহসান মনি, প্রকৌশলী তুষার, মাহবুব উল আলমসহ আরো অনেকে।


একাত্তরের ভয়াল দিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দাতা সখিনা বেগমের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি এতটুকু। অভাব অনটনের সাথে যুদ্ধ করে কোনরকমে টিকে আছেন তিনি।


এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা অরুণ দাশ সাথী বলেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের ব্যাপার যে, স্বাধীনতার এতবছর পরও সখিনা বেগমদের কোন উন্নতি হয়নি। অথচ তাদের মত সাহসী মানুষেরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা না করলে হয়তো অনেক যোদ্ধার জীবন বিপন্ন হতো দ্রুত। তিনি সখিনা বেগমকে সঠিক মূল্যায়নের জন্য কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন