
চট্টগ্রাম নগরীর পূর্ব বাকলিয়ায় পুকুর ভরাট
তুষার দেব
জলাশয় সংরক্ষণ আইন, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ও সিটি মেয়রের হুশিয়ারি হুংকার- কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না পুকুরখেকোরা। নগরীর বাকলিয়ায় অনেকটা প্রকাশ্যেই ভরাট করা হচ্ছে ১৮ বছরেরও বেশি পুরনো একটি পুকুর। বালি ফেলে ইতোমধ্যে পুকুরটির অর্ধেকাংশ ভরাট কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
নগরীর কালামিয়া বাজারের আনুমানিক দেড় কিলোমিটার পূর্বে ১৮ নং পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডের আব্দুল লতিফ হাট এলাকার সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অদূরে সড়কের দক্ষিণ পাশে পুকুরটি’র অবস্থান। ওই এলাকার বনেদী পরিবার আব্দুল্লাহ সওদাগরের বিপুল ভূ-সম্পত্তি রয়েছে। আলোচ্য পুকুরটি এলাকার লোকজনের কাছে আব্দুল্লাহ সওদাগরের পুকুর নামে পরিচিত। আনুমানিক ১৬ শতক আয়তনের পুকুরের আগে সড়কের সাথে লাগোয়া প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ খালি জায়গা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সেখানে সরেজমিনে গিয়ে একাধিক দোকানদারের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এখানে পুকুরটি রয়েছে। ১৭/১৮ বছর আগে আব্দুল্লাহ সওদাগর নিজে সড়কের পাশে জায়গা ভরাটের জন্য পুকুরটি খনন করেন। ওই পুকুরের মাটি দিয়েই পাশের জায়গা সড়কের সাথে মিলিয়ে উঁচু করা হয়। এরপর তিনি সেখানে কাঁচা ঘর তৈরি করে ভাড়ায় লাগান। ওই জায়গা তখন পরিচিতি পায় ‘আব্দুল্লাহ সওদাগরের কলোনি’ নামে। কলোনির বাসিন্দাসহ এলাকার লোকজন পুকুরটি গোসলসহ নানা কাজে ব্যবহার করে। কিছুদিন আগে পুকুরসমেত ওই জায়গা তিনি বিক্রি করে দেন। তার ছেলে মোহাম্মদ মহসীন শ্বশুর পক্ষকে এ জায়গা কিনে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এরপর ভেঙে ফেলা হয় কলোনি। গত একমাস ধরে মহসীন নিজের তত্ত্বাবধানে পুকুরে বালি ফেলে ভরাটের কাজ শুরু করেন। স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ শফিকে তিনি বালি ফেলার দায়িত্ব দেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে শফি রাতের বেলা ট্রাকভর্তি বালি এনে পুকুরে ফেলা শুরু করেন। ইতোমধ্যে পুকুরের অর্ধেকাংশ ভরাট কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতেও পুকুরে ট্রাকভর্তি বালি ফেলা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ শফি প্রথমে সুপ্রভাত বাংলাদেশকে কিছুই জানেন না বলে জানান। পরক্ষণে আবার বলেন, ‘জায়গাটি আব্দুল্লাহ সওদাগরের। তার ছেলে মহসীন আমার ঘনিষ্ঠ। কিছুদিন আগে তাদের আত্মীয়দের ভেতরেই জায়গাটি বিক্রি হয়েছে। এরপর থেকে কলোনি ভেঙে পুকুরটি বালি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। আমি সে কাজে যতদুর সম্ভব সহযোগিতা করি’। আইন অনুযায়ী নগরীতে যে পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ তা জানেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আরও অনেক পুকুর ভরাট করেছি। কই কখনও তো সমস্যা হয় নি। আমার মনে হয় আপনি (প্রতিবেদক) কোন পলিটিক্স করছেন। ওরা সবাই পয়সাওয়ালা। আশা করি, কোন সমস্যা হবে না’।
এর কিছুক্ষণ পর মোহাম্মদ শফি তার মোবাইল ফোন থেকে আবার কল করে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলেন’। অপরপ্রান্ত থেকে অন্যজন নিজেকে ‘ছাত্রদল নেতা সাহেদ’ পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আপনি মনে হয় আমাদেরকে হয়রানি করার চেষ্টা করছেন। নাকি রসিকতা করছেন। আমাকে তো আপনার চেনার কথা। এসব বাদ দেন। আপনি যা করছেন সেসব পথ আমি চিনি’। এরপর পরে কথা হবে বলে লাইন কেটে দেন।
পুকুরের পাশ্ববর্তী মাঠেই গত ২২ ফেব্রুয়ারি ‘কথিত একুশ মেলা’ উদ্বোধন করেছিলেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর এম জসিম উদ্দিন। পুকুর ভরাটের বিষয়টি তার চোখে পড়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি খেয়াল করি নি। আপনি যখন বলেছেন আমি কালকেই তাদের ডেকে পুকুর ভরাট বন্ধের ব্যবস্থা করব’।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পুকুর বা জলাশয় সংরক্ষণ আইন -২০০০ অনুযায়ী নগরীতে পুকুর এবং জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ ও বে-আইনী। কারণ, পুকুর ভরাট হলে তা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর’। আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫৫ তম সাধারণ সভায় সভাপতির বক্তব্যে মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী নগরীতে হাজা-মজা পুকুরের নামে কেউ পুকুর কিংবা জলাশয় ভরাট করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন। তারপরও থেমে নেই পুকুর ভরাট।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন