সোহরাওয়ার্দী দু শ টাকা বকশিশ দিয়েছিলেন
মো. শাহ বাঙালি
আসল নাম মো. শফিউল্লাহ। পাকিস্তান আমলের সেই আন্দোলনমুখর দিনগুলোতে বাংলা ও বাঙালির পক্ষে গান গেয়ে নাম হয়েছে মো. শাহ বাঙালি। পথে-প্রান্তরে, জনসভায় গান গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন তিনি। সান্নিধ্যে এসেছেন অনেক বিখ্যাত রাজনীতিকের। তাঁর নানা রঙের দিনগুলির কথা বলেছেন মুহাম্মদ শামসুল হককে
শৈশব কেটেছে গ্রামেই। পড়ালেখার সময় এলাকায় পুঁথিপাঠ ও জারি গানের আসর বসত। অন্যের দেখাদেখি আমিও পুঁথিপাঠে অংশ নিই। অল্পদিনের মধ্যেই এলাকায় আমার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রাবস্থায় আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। ওই সময় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাদের নাম-গুণ শুনে তাঁদের নামের সঙ্গে কথা মিলিয়ে গান লেখা ও গাওয়া শুরু করি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর একদিন সন্দ্বীপে একটি বড় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে শিল্পী এমএ সালামকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গান করার জন্য। স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট করিম সাহেব এমএ আজিজের কাছে আমাকে নিয়ে বললেন, ‘আমাদের শফির একটা গান শুনে দেখুন।’
অনুমতি পেয়ে আমি গাইলাম, ‘ওরে বাঙালির দল, নিজের পায়ে নিজে হেঁটে চল। বসত করি স্বাধীন রাষ্ট্রে, দিন কাটে যে দুঃখ-কষ্টে, আমরা বেঁচে থাকি কেমনে বল। খানেরা যেমন, আমরাও তেমন, ভয় করব না হুমকি-ধমকি, থাকতে বুকের বল।’ আমার গান করার পর সালাম সাহেব চলে গেলেন। অন্যদিকে গান শুনে তাজ্জব বনে যান এমএ আজিজ। তিনি আমাকে শহরে এসে গান করার কথা বলেন। মনে মনে খুবই খুশি হলাম। কারণ কোনো বড় নেতার উপস্থিতিতে এলাকার বড় কোনো সমাবেশে এটাই আমার প্রথম গান গাওয়া। এরপর থেকে গানকেই বিশেষ করে দেশের জন্য, দেশের মানুষকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলার জন্য ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে জেনেছি।
আমার আসল নাম মো. শফিউল্লাহ। বাবা খুরশিদ আলম মিয়া এবং মা উম্মে খায়রুন ফাতেমা-দুইজনই প্রয়াত। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি ছোট। সন্দ্বীপের হরিশপুর গ্রামে আমার জন্ম। জন্মতারিখ সুনির্দিষ্ট মনে না থাকলেও বয়স ৭৮-৮০ বছরের কম হবে না। আমার তিন স্ত্রীর প্রথম জন মারা গেছে। এরপর দ্বিতীয় জনও চলে যায়। তৃতীয় জন বর্তমানে সংসারের দেখাশোনা করছে। সাত ছেলে ছয় মেয়ের মধ্যে এক ছেলে মারা গেছে, মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। ছেলেদের কেউ চাকরি, কেউ ব্যবসা করছে।
পড়ালেখা সন্দ্বীপ উচ্চবিদ্যালয়েই করেছি। তবে স্থানীয়ভাবে সুযোগ-সুবিধা ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পড়ালেখায় তেমন এগোতে পারিনি।
পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার সভা-সমাবেশে আমার ডাক আসতে শুরু করে। আমিও গিয়ে সরকারের নানা অপকর্মের ওপর লেখা গান গাইতে থাকি। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মারা যাওয়ার পর আইউববিরোধী মোর্চা এনডিএফ গঠন করা হয়। মোর্চার উদ্যোগে লালদিঘি মাঠে আয়োজিত সমাবেশে আসতে বলা হয় আমাকে। ওই সমাবেশ গান করতে পারাটা ছিল আমার জীবনের প্রথম ও অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। কারণ সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তত্কালীন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। এমএ আজিজ আমাকে সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমার গান শুনে সবাই হাততালি দিলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব খুশি হয়ে আমাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি গরিব আছ, নাও এই ২০০ টাকা বকশিশ দিলাম।’ সন্দ্বীপের মানুষ জেনে একদিকে তাজ্জব, অন্যদিকে আত্মহারা।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে প্রায় সময়। আমার বড় ভাই ছিলেন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। ছোট কাল থেকেই যে আমি পুঁথি-গান ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম তিনি তা পছন্দ করতেন না। তাই গান না করার জন্য একদিন আমাকে তিনি ঝাড়ু দিয়ে মেরেছিলেন। লালদিঘির মাঠে আমার গানের সুনাম এবং সোহরাওয়ার্দী টাকা দিয়েছেন জেনে তিনিও অবাক হন। বলেন, ‘আরে আমি কারে মাইরলাম। যারে মারি সে রাজা-উজিরের পিছে গান গায়, আর আমি ওনাদের ডিউটি করি।’
১৯৬৬ সালের কথা। আমি তখন সন্দ্বীপের ইজ্জতপুর ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। এমএ আজিজ তখন বন্দী। লালদিঘি মাঠে জনসভায় গান গাওয়ার জন্য আমার ডাক পড়ল। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে গেয়েছিলাম ‘বিশ্ববাসী একবার আসিয়া সোনার বাংলা যাও দেখিয়ারে।’ সভা শেষে বঙ্গবন্ধু আমাকে নিয়ে গেলেন সদরঘাট হোটেল শাহজাহানে। সেখানে কলা-মুড়ি খাইয়ে বললেন, ‘এখন থেকে তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।’ আমি চেয়ারম্যানশিপের কী হবে জানতে চাইলে বললেন, ‘ওসব বাদ দাও। আমার সঙ্গে থাক, কিছু লাগবে না।’ আমি বাড়ি গিয়ে আমার স্ত্রীকে সব খুলে বললাম। সে বলল, ‘প্রয়োজনে ভিক্ষা করে খাব, তবু তুমি এই মহান নেতাকে ছাড়িও না।’ সেই থেকে তাঁর জীবদ্দশার বেশির ভাগ সময় তাঁর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে গান তৈরি এবং গাওয়ার নেশায় মত্ত থেকেছি। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের এমন কোনো মাঠ নেই যেখানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যাইনি এবং গান গাইনি। এ ছাড়া, এমএ আজিজ, এমআর সিদ্দিকী, আতাউর রহমান খান, আখতারুজ্জামান চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক মো. খালেদ, মির্জা আবু মনসুরসহ কতজনের নির্বাচনী সমাবেশে গান গেয়ে মানুষের মনে জাগরণের ঢেউ তুলেছি তার ইয়ত্তা নেই। বিশেষ করে ৭০-এর নির্বাচনের আগে রাতের ঘুম বলতে গেলে হারাম হয়ে গিয়েছিল।
মনে আছে, বঙ্গবন্ধুর অনেক জনসভায় বক্তৃতা শুরুর আগে শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি বলতেন, ‘ভাইয়েরা, আমি খুবই ক্লান্ত। আমার সঙ্গে স্বর্ণদ্বীপের একজন কবি আছে। প্রথমে তাঁর গান শোনেন, তারপর আমি বক্তৃতা দেব।’ আমার নির্বাচনী গানের অন্যতম একটি হচ্ছে ‘মুজিব বাইয়া যাওরে...নিপীড়িত দেশের মাঝে জনগণের নাওরে মুজিব বাইয়া যাওরে। মুজিবরে... আকাশ কাঁদে বাতাস কাঁদে...কাঁদেরে বাঙালি..., নির্যাতিত মানুষ কাঁদে মুজিব মুজিব বলিরে মুজিব বাইয়া যাওরে।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার-পরিজন ছেড়ে ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে নিয়মিত গান গেয়েছি, পুঁথি পড়েছি, আর এমআর আখতার মুকুলকে চরমপত্র তৈরিতে সহযোগিতা করেছি। গান গেয়েছি কলকাতার লেলিন স্মরণী, কলেজ স্ট্রিট, শ্যামবাজার ও বউবাজারসহ অনেক জায়গায়। আকাশবাণীতেও গেয়েছি অনেক। যেমন ‘ও আমার ভারত ভূমি মাগো তুমি ওগো আমার প্রাণ/একটি বৃন্দে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান। তোমার স্নেহের আঁচল পাতি বাঁচছে ৩৬ জাতি/হিন্দু-মুসলিম প্রেমের গীতি গাহি সাম্যের গান।’
অনেক দিন আগের কথা। সব কথা মনে পড়ে না। তবে ভুলিনি শান্তি নিকেতনে বাংলা এবং দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে হিন্দি গান গাওয়ার মধুর স্মৃতি। শান্তি নিকেতনের অনুষ্ঠানে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে স্লোগান ধরার কথাও ভুলিনি। ভারতে টাটার এক কর্মকর্তা এবং চলচ্চিত্র শিল্পী-দম্পতি আজিম-সুজাতা একদিন আমাকে খবর দেন, বাংলাদেশের হাইকমিশনার হোসেন আলী আমাকে খোঁজ করছেন। শান্তি নিকেতনে একটি সংগীতানুষ্ঠান হবে, সেখানে গান গাইতে হবে। তিন-চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষ আর মানুষ। বহু নামীদামি, জ্ঞানীগুণী মানুষ আর রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীর সমাবেশ সেখানে। ছিলেন কবিগুরুর মেয়েও। সেই স্মরণীয় অনুষ্ঠানে আমি গাইলাম ‘আমার মন ভুলালো, দিল জুড়ালো, কেড়ে নিল মন/কবিগুরুর শান্তি নিকেতন। সাঁওতালেরা নাশতা করে খোঁপায় খোঁপায় ফুল/বাউলের বাঁশির সুরে প্রাণ করে আকুল।’ অনুষ্ঠানে অনেকে জানতে চেয়েছিলেন আমি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, কোন বিষয়ে পড়ালেখা করেছি। বলেছিলাম, ‘আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, জ্ঞান বিতরণ করেছেন। যাঁরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন তাঁরা কোন কলেজ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন? আমি সৃষ্টিকর্তার কলেজ থেকে শিক্ষা নিয়েছি।’
পৌষের এক দিন হাইকমিশনার হোসেন আলীর অনুরোধে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে এক অনুষ্ঠানে গান গাই। অবশ্য হিন্দিতে। সেদিন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি হোসেন আলীর হাতে তিন লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন বাঙালিদের সাহায্যের জন্য।
এ পর্যন্ত সাত হাজারের মতো গান করেছি। দুঃখের বিষয় হলো, একান্নব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ের সময় বেশির ভাগ গান হারিয়ে গেছে। হাজার তিনেক গান এখনো আছে। রাজনৈতিক সমাবেশ ছাড়াও বেতারে গেয়েছি প্রচুর। ১৯৯৬ সালের শেষ দিক থেকে টেলিভিশনের চট্টগ্রাম ও ঢাকা কেন্দ্রেও কিছু গান গেয়েছি। তবে আওয়ামী লীগ সরকার যাওয়ার পর আমার গান প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয় আমি মুজিব ভক্ত হওয়ার অপরাধে। বর্তমানে মাসে দুই-একটা গানের সুযোগ দেয় চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র। অবশ্য বয়স এবং রোগশোকের কারণে আগের মতো ভালো করে গাইতেও পারি না। তাই আয় রোজগার বলতেও তেমন কিছু নেই। বঙ্গবন্ধু বা এমএ আজিজ বেঁচে থাকলে হয়তো আজ আমার কোনো চিন্তা ছিল না। এ দুজনের স্নেহ আর গুণের কথা এখনো ভুলতে পারি না। বঙ্গবন্ধু আমাকে একটি মাজেদা গাড়ি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে টাকা দিয়েও সাহায্য করেছেন। তাঁর ইচ্ছাতেই বেতারে আমাকে সর্বোচ্চ সম্মানী দেওয়া হয়। তিনি বেঁচে থাকলে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা পদক পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু এখন কেউ খবরও রাখেন না। সব শেষে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির উদ্দেশে আমার একটি গানের চরণ শুনিয়ে বিদায় নিতে চাই ‘দারুণ বিধিরে সদা উঠে মনে, জাতির জনক বীর মুজিবকে ভুলি কেমনে ।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন