
‘ছয় ‘মালিকের’ হাতেই অজ্ঞান পার্টির লাগাম’
‘জাফর, খোরশেদ, মিজান, এয়াকুব, শাহীন ও জাহাঙ্গীর। তারাই নগরীর অন্তত চারটি অজ্ঞান পার্টির ৩০ সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ওরা ছয়জনই হচ্ছে অজ্ঞান পার্টির ‘মালিক’। এরমধ্যে কেবলমাত্র এয়াকুবই কারাগারে রয়েছে। বাকি পাঁচজন ধরা পড়লে নগরীতে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা আর চোখে পড়বে না’। নগরীর কোতোয়ালি থানায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এমন দাবি করেছেন অজ্ঞান পার্টির তিন সদস্য শাহজাহান, হারুণ ও দীপংকর। গতকাল মঙ্গলবার মহানগর হাকিম মাহবুবুর রহমানের আদালত থেকে দু’দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা এমন দাবি করেন। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোতোয়ালি থানার একটি ছিনতাই মামলায় (নম্বর ঃ ৩৬) তাদেরকে রিমান্ডে আনা হয়েছে। গত শনি ও রোববার নগরীর মনছুরাবাদ ও মতিঝর্ণা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তবে, পুলিশের হাত থেকে ফসকে গেছে দলনেতাদের অন্যতম মোহাম্মদ জাফর। কোতোয়ালি থানার উপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ মহসিন ও সদীপ কুমার দাশ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। মঙ্গলবার বিকেলে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। থানায় বসে তারা পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
জিজ্ঞাসাবাদে শাহজাহান ও দীপংকর জানান, জাফরের নেতৃত্বে পরিচালিত অজ্ঞান পার্টির সদস্য হিসেবে তারা কয়েকবছর ধরে কাজ করছে। জাফরের দুই স্ত্রী। মতিঝর্ণায় লুটের টাকা দিয়ে জায়গা কিনে পাকা বাড়ি করেছে। আদি বাড়ি সিলেটে। তার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি দল রয়েছে। পরিস্থিতি যেখানে নিরাপদ থাকে সেখানেই তিনি অবস্থান করেন। আনুমানিক ১৫/১৬ বছর ধরে তিনি এ অপরাধ সংঘটিত করে আসছে। এসআই মহসিন জানান, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ডবলমুরিং থানাধীন আবাসিক হোটেল সিলেট থেকে তাদের ১৩ সদস্যকে আটক করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে তারা একে একে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে। এ গ্রুপের প্রায় সকলের বাড়ি নোয়াখালী সেনবাগ ও বেগমগঞ্জ থানা এলাকায়। সীতাকুন্ড, বায়েজিদ ও চান্দগাঁও থানা পুলিশের হাতে অতীতে কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছিল। সব কাজের টাকা জাফরের হাতেই থাকে। তিনিই যোগ্যতা অনুযায়ী সদস্যদের মধ্যে টাকা ভাগ করে দেন। দুঃসময়ে তিনি সদস্যদের ব্যয়ভার বহন করেন। কখনও গাড়িতে ক্যানভাসার, কখনও ডাব বিক্রেতা সেজে যাত্রীদের চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে দিয়ে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়াই তাদের প্রধান কাজ। এজন্য ডাব কিংবা চ্যবনপ্রাশের সাথে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দেয়া হয়। গাড়িতে ডাক্তার সেজে টার্গেটের পাশে বসেন দলনেতা। বাকিরা তাকে আড়াল করে আশেপাশে দাঁড়ায়। এরপর নিজেদের লোকজনকে আসল কৌটার ওষুধ খেতে দিয়ে টার্গেটের হাতে দেয়া হয় চেতনানাশক মিশ্রিত কৌটাটি। এরপর সব হাতিয়ে নিয়ে সুবিধাজনক স্থানে একেকজন গাড়ি থেকে নেমে যায়। বিশেষ করে সীতাকুন্ড, হাটহাজারী, পটিয়া থেকেই তারা শহরমুখী বাসের যাত্রীকেই টার্গেট করে।
শালা-দুলাভাই ও শ্বশুর- জামাই একাকার
অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা ছয়টি গ্রুপে বিভক্ত হলেও এদের মধ্যে কয়েকজনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা রয়েছে। পরস্পরের আত্মীয় হয়েও তারা একসাথে কাজে নেমেছে। গ্রেফতারকৃত শাহজাহান ও দীপঙ্কর জানান, কারাবন্দি এয়াকুবের মেয়ের জামাই হচ্ছে শাহীন। এয়াকুব জেলে যাওয়ার পর থেকে শাহীনই তার গ্রুপটি নিয়ন্ত্রণ করছে। আদালতে হাজিরা দিতে এলে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাদের। অপরদিকে, জাফরের বোনের জামাই হচ্ছে গ্রেফতারকৃত শাহজাহান। তারাও একসাথে কাজ করেছে। রোববার পুলিশের হাতে ধরা পড়ার সময় দুলাভাই জাফরও তার সাথে ছিল। কিন্তু, তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এভাবে, কারাগারে থাকা অবস্থায় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা একে অন্যের ‘ধর্মের ভাই’ বলেও কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেয়। পরস্পরের উপর আস্থা স্থাপনের জন্যই এমনটি করা হয় বলে তারা জানিয়েছে। কেবল অজ্ঞান করে হাতিয়ে নেয়া নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্যদের কেউ কেউ ব্লেড দিয়ে পকেট কাটতেও সিদ্ধহস্ত।
হারুণ পৃথক দলের ‘মালিক’
গ্রেফতারকৃত তিনজনের মধ্যে হারুন নিজে পৃথক একটি গ্রুপের ‘মালিক’। আগে জাফরের হয়ে কাজ করলেও ভাগাভাগির গন্ডগোলে সে গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর নিজের নেতৃত্বে আলাদা গ্রুপ গঠন করে। মোহাম্মদ আলী, রফিক, সোহাগ, মিলন, নুরুজ্জামান তার গ্রুপের সদস্য। নিউমার্কেট, অলংকার, নতুন ব্রীজ, বহদ্দারহাট ও ফ্রি-পোর্ট এলাকা তাদের বিচরণ ক্ষেত্র। এছাড়া, আনোয়ার, জাহাঙ্গীর, জসিম, ভুট্টো, খোরশেদ, ইব্রাহিম, সাজু মেম্বারসহ আরও কয়েকজন সদস্যের নাম পুলিশকে জানানো হয়েছে। দলনেতা হারুণ টাইগারপাসে থাকত। সেখানে দেলোয়ার হত্যা মামলায় জড়ানোর পর অবস্থান পাল্টে ফেলে। খুলশী থানায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলাও রয়েছে। আদি বাড়ি মিরসরাইয়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেই তাদের আনাগোনা বেশি। এ পর্যন্ত কী পরিমাণ কাজ করেছে তা তারা হিসেব করে বলতে পারে নি।
এদিকে, পুলিশ জানিয়েছে তাদেরকে আজ বুধবারও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরপর তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানে রাজি হলে তা রেকর্ড করা হবে। পাশাপাশি অপরাপর সহযোগীদের গ্রেফতারে চালানো হবে অভিযান।
তথ্য সূত্র: সুপ্রভাত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন