শনিবার, ৬ মার্চ, ২০১০

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ছিনতাই-চাঁদাবাজি থামেনা,পানি সংকট সারাবছর


পাহাড়তলীতে ছিনতাই-চাঁদাবাজি থামেনা,পানি সংকট সারাবছর রিটন আহসান


ছিনতাই, চাঁদাবাজি, পানির সংকটের মত অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের কয়েকহাজার মানুষ। এসব সমস্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানিয়েও সুরাহা মিলেনি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।


ওয়াসার পানি সংকট : ওয়ার্ডের নানা এলাকায় রয়েছে খাবার পানিসহ নিত্য ব্যবহার্য পানির তীব্র সংকট। এলাকার প্রধান সড়কের পাশেই রয়েছে ওয়াসার পানির লাইন। কিন্তু অলি-গলিতে নেই। ফলে ইচ্ছে করলেই সবাই ওয়াসার লাইন টানতে পারছে না। আবার যাদের ওয়াসার লাইন রয়েছে তারাও চাহিদা অনুযায়ী পানি পাচ্ছেন তা নয়। সরাইপাড়ার মোমিনুল হক বলেন, এখানে নিয়মিত পানি আসে না, মাঝে মাঝে আসে তাও এত কম সময়ের জন্য যা দিয়ে কোন কাজ করা সম্ভব হয়না। এদিকে প্রতিনিয়ত এখানকার জলাশয়গুলো ভরাট করার ফলে ভবিষ্যতে দারুণ জলকষ্টের কারণ হতে পারে বলে শংকা প্রকাশ করছেন এলাকার সচেতন জনগোষ্ঠী।


এ বিষয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন বলেন, এলাকায় বেশকয়েকটি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে বাস করা অসংখ্য মানুষের জন্য নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। পাশাপাশি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দারাও বঞ্চিত ওয়াসার পানি সরবরাহ থেকে। ফলে এখানকার বাসিন্দাদের নির্ভর করতে হচ্ছে গভীর-অগভীর নলকূপের ওপর। তিনি জানান, এ সব এলাকায় ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ওয়াসার পানি বন্ধই ছিল একরকম।


সমস্যায় জর্জরিত ঝাউতলা বিহারি কলোনি : ঝাউতলা বিহারি কলোনিতে নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করছে কয়েকহাজার অবাঙালি পরিবার। যাদের অধিকাংশই বিহারি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে এসব পরিবার বাস করে আসছে এখানে। সময়ের সাথে সাথে এখানকার লোকসংখ্যা বেড়েছে কিন্তু বাড়েনি জায়গার পরিমাণ। ফলে সামান্য জায়গায় ঘিঞ্জি পরিবেশে বাস করে আসছে অনেকগুলো মানুষ। বিহারি কলোনির বাসিন্দা মোহাম্মদ এজাহার মিয়া জানান, এখানে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য হাতে গোনা কয়েকটি ওয়াসার লাইন রয়েছে। একাধিক ডিপটিওবেলও রয়েছে কিন্তু তবুও বাসিন্দাদের পানির সংকটে পড়তে হয় বেশিরভাগ সময়। তাছাড়া এখানকার পয়ঃ নিষ্কাশন ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক বলে জানান তিনি।


রাস্তায় বিদ্যুৎ বাতির বেহাল অবস্থা : ওয়ার্ডের দক্ষিণ খুলশীসহ নানা এলাকার রাস্তায় সিটি কর্পোরেশনের বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলোতে বাতি নেই। থাকলেও তা নিয়মিত মেরামতের অভাবে বন্ধ থাকে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এলাকার বাসিন্দা দক্ষিণ জেলা কৃষক দল সভাপতি এবং দক্ষিণ খুলশী আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির কর্মকর্তা সৈয়দ সাইফুদ্দিন বলেন, এলাকায় অনেকগুলো বৈদু্যুতিক খুঁটি থাকলেও তা জ্বলে না নিয়মিত। একবার কোন কারণে একটি বাতি নষ্ট হলে মাসের পর মাস ওয়ার্ড কাউন্সিল কিংবা সিটি কর্পোরেশনের সাথে যোগাযোগ করেও তা মেরামত করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব এলাকায় সন্ধ্যার পরপরই শুরু হয় ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম।


মাদক ব্যবসা : ওয়ার্ডের পাঞ্জাবি লেইন, আমবাগান, ঝাউতলা, মাস্টার লেইনসহ নানা এলাকা জুড়ে রয়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আনাগোনা। বিশেষ করে আমবাগান ও টাইগার পাস সংলগ্ন বস্তিগুলোতেই চলছে এসব মাদক ব্যবসা। এ ব্যাপারে আমবাগান এলাকার মহিউদ্দিন সরকার জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম ক্রমশ এতটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, এলাকার তরুণ সমাজ নানাভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে মাদকের সাথে। শুধু তাই নয় ওয়ার্ড কার্যালয়ের সামান্য দূরেই রয়েছে বিশাল বস্তি। এসব বস্তিতেও চলছে মাদকের জমজমাট ব্যবসা। মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে জড়িত রয়েছে পুলিশের একটি অংশ। তারা নিয়মিত চাঁদা নিয়ে অবৈধ মাদক ব্যবসার সুযোগ করে দেয় বলেও অভিযোগ একাধিক ব্যক্তির।


এ বিষয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর জানান, গোটা এলাকায় মাদক ব্যবসার কথাটি সত্য নয়। এক সময় এটি ভয়াবহ আকারে দেখা দিলেও বর্তমানে তা অনেকাংশেই কমে এসেছে। তিনি বলেন, মূলত বস্তিগুলোকে ঘিরেই মাদকের ব্যবসা চলে। বর্তমানে মাস্টারলেইন ঝিলেরপাড় বস্তিতে কতিপয় মহিলা এই ব্যবসার সাথে জড়িত।


ছিনতাই : পাহাড়তলীর একাধিক স্থানে পথচারীদের সর্বস্ব খোয়াতে হয় ছিনতাইকারীদের হাতে। আমবাগান, জাকির হোসেন রোড, একে খান গেইট ইত্যাদি এলাকায় সন্ধ্যার পরপরই ছিনতাইকারীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এলাকার অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি স্থানে অবস্থান নেয়। পরে সুযোগ বুঝে চড়াও হয় পথচারীর ওপর। ছিনতাইকারীদের সাথে জড়িত রয়েছে কিছু অসাধু সিএনজি টেক্সি চালক। এসব চালকের সাথে ছিনতাইকারীদের রয়েছে দারুন সখ্যতা।


এলাকার খোলা পায়খানা : ওয়ার্ডের বিভিন্ন কলোনিগুলোতে খোলা পায়খানার কারণে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ করলেন খোদ ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তিনি জানান, আমরা প্রায়ই দেখি রেলওয়ের বিভিন্ন কলোনির আধুনিকায়নের জন্য বড় অংকের টাকা বরাদ্ধ দেয়ার বিজ্ঞাপন। তা সত্বেও কলোনিগুলোর টয়লেটগুলো এখনো মান্ধাতার আমলের ধাঁচে রয়ে গেছে। এসব টয়লেটের মলমূত্র কোন টাংকিতে রিজার্ভ না করে সরাসরি নালায় ফেলা হয়। ফলে আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ায়।


ওয়ার্ড কাউন্সিলর বলেন, এ বিষয়ে রেলওয়ের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হলেও কোন সুরাহা মিলেনি।


আমবাগান এলাকায় তল্লাশীর নামে পুলিশের হয়রানি : ওয়ার্ডের আমবাগান এলাকায় প্রতিনিয়ত পুলিশ তল্লাশীর নামে নিরীহ পথচারীকে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকার একাধিক বাসিন্দা। রেলওয়ে প্রিন্টিং প্রেস কলোনির বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফুল হক জানান, এই রোডটি অন্যান্য রোডের তুলনায় কিছুটা নিরিবিলি হবার কারণে এখানে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রায় সর্বস্ব হারাতে হয় পথচারীদের। এজন্য এখানে পুলিশের কিছু সদস্য রাতের বেলা পাহারা দিয়ে থাকে। কিন্তু এতে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হচ্ছে। আরিফুল হক জানান, টহলরত এসব পুলিশ সদস্য সন্ধ্যার পরপরই সড়কের কয়েকটি নিরিবিলি স্থানে বড় গাছ কিংবা কোন দেয়ালের আড়ালে দাড়িয়ে থাকে। একসময় তারা তল্লাশীর নামে নিরীহ পথচারীকে নানারকম ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে থাকে। কোনধরনের প্রতিবাদ করলে পুলিশ থানায় নিয়ে যাবার ভয় দেখায়।


এ প্রসঙ্গে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরন বলেন, বিষয়টি সত্য। শুধু তাই নয় আমি নিজেও একাধিকবার পুলিশের এ ধরনের হয়রানি থেকে একাধিক পথচারীকে উদ্ধার করেছি এবং সংশ্লিষ্ঠ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে থানাকে জানিয়েছি।


তবে এ ব্যাপারে খুলশী থানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কিছুই জানেন না বলে জানান। থানার এসআই বশির জানান, এ পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ কেউ করেনি। যেহেতু বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হলাম এখন থেকে আমরা দেখব কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত।


ওয়ার্ডে যা রয়েছে : ওয়ার্ডের মোট আয়তন ৬ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা ১লক্ষ ৮০ হাজার। মোট ভোটার ৫৫ হাজার। এলাকায় কলেজ আছে ১ টি। বিশ্ববিদ্যালয় আছে ২টি। হাই স্কুল আছে ৫টি। এখানে আরো আছে রেলওয়ে কারখানা, রেলওয়ে যাদুঘর, আবহাওয়া অধিদফতর, টেলিভিশন কেন্দ্র, চক্ষু হাসপাতাল, কিডনি হাসপাতাল, ডায়াবেটিস হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন