
চট্টগ্রামে রানীর দীঘি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ এনায়েত বাজারের রানীর দীঘিতে চলছে রাস্তা নির্মাণের কাজ। দীঘির পূর্ব অংশে গত প্রায় এক বছর ধরে এই রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, চারপাশে রাস্তা তৈরি করে দীঘির পরিসর ছোট করে ফেলা হচ্ছে। অন্য অংশ দাবি করছেন, সিটি কর্পোরেশন এলাকাবাসীর সুবিধার জন্য রাস্তা নির্মাণ করছে। তবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে জলাশয়ের জমিতে রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে কোনো অনুমতি নেয় নি সিটি কর্পোরেশন। গতকাল শনিবার দুপুরে রানীর দীঘিতে গিয়ে দেখা যায়, আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার শ’খানেক মানুষ দীঘিতে গোসল করছেন। তাদের সাথে আলাপে জানা যায়, এনায়েত বাজার, জুবিলী রোড ও রিয়াজুদ্দিন বাজার এলাকার একমাত্র পানির উৎস এই দীঘি। তবে দীঘিতে পানির পরিমাণ আগের তুলনায় কমে গেছে। এবিষয়ে দীঘিতে গোসল করতে আসা রিয়াজুদ্দিন বাজারের শ্রমিক দুলাল মিয়া বলেন, কয়েক মাস আগে দীঘির পানি আংশিক সেচে ফেলা হয়। তারপর পূর্ব পাড়ের রাস্তার কাজ শুরু করা হয়। সরেজমিন ঘুরে এবং এলাকাবাসীর সাথে আলাপে জানা যায়, দীঘির পশ্চিম পাড় এবং উত্তর পাড়ে আনুমানিক আট থেকে দশ বছর আগেই দীঘির জমি ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে দীঘিটি কিনে নেন কাজী জাকির হোসেন। এসময় তিনি দীঘিটি ভরাট করে প্লট তৈরির উদ্যোগ নেন। তখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে নাগরিক আন্দোলন। আন্দোলনের কারণে প্লট তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন দীঘির মালিক। এলাকার বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, দীঘির আয়তন আনুমানিক ৮১ কাঠা। আগে দীঘি আরো বড় ছিল। দীঘির জমিতেই পশ্চিম ও দক্ষিণ পাড়ের রাস্তা হয়েছে। দীঘি রক্ষা আন্দোলনের পর সিটি কর্পোরেশন এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। তখন দীঘির চারপাশে গার্ড ওয়াল নির্মাণ করে সিটি কর্পোরেশন। রানীর দীঘির পূর্ব পাড়ের রাস্তার প্রায় অর্ধেক অংশের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এই অংশ নির্মাণ করা হয়েছে দীঘির জমিতেই। দীঘির ভেতর ্যাব বসিয়ে মাটি এবং ইট সুরকি ফেলে ১২ থেকে ১৫ ফুট প্রস্থের এই রাস্তা তৈরি করা হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানান। পূর্ব পাড়ের বাকি অর্ধেক অংশের নির্মাণ কাজের জন্য ্যাব বসানো হয়েছে। দীঘিতে রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে সুপ্রভাত বাংলাদেশের প্রতিবেদক এবং ফটো সাংবাদিককে দীঘির ছবি তুলতে নিষেধ করেন দীঘির উত্তর- পূর্ব কোণের একাধিক ভবনের বাসিন্দারা। এসময় চারজন তরুণ বলেন, আপনারা চান না মানুষের উপকার হোক। এখানে কোনো রাস্তা নেই। তাই আমাদের চলাচলে সমস্যা হয়। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে পারে না। কিন্তু দীঘির উত্তর পাড়ের সাথে এনায়েত বাজারের সংযোগ সড়কটি অত্যন্ত সরু। দীঘির পাড়ে রাস্তা হলে, গাড়ি কোন পথে প্রবেশ করবে জানতে চাইলে তারা বলেন, ওই রাস্তা বড় হবে। দুইপাশের জমির মালিকরা রাস্তার জন্য জমি দেবেন বলে জানিয়েছেন। দীঘির দক্ষিণ- পশ্চিম কোণে একটি সড়ক আছে। সড়কটি জুবিলী রোডের রূপালী ব্যাংক শাখার সামনে দিয়ে মূল সড়কে যুক্ত হয়েছে। এটি প্রায় ১২ ফুট প্রস্থের। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, রাস্তা নির্মাণের জন্য সিটি কর্পোরেশনের লোকজন তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ বলেন, দীঘির পানি সেচা এবং মাটি ফেলার জন্য প্রতি পরিবার থেকে এক হাজার টাকা করে সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীদের টাকা দিয়েছি। তবে যে ব্যক্তির কাছে টাকা দিয়েছেন তার নাম বলতে পারেনি ওই যুবক। এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, এই রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে কোনো ওয়ার্ক অর্ডার হয়নি। তবে রাণীর দীঘিতে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে এটি আমি জানি। ২২ নম্বর এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এম. এ. মালেক বলেন, আপনারা সাংবাদিকরা মানুষের উপকার হোক এটা চান না। লেখালেখি করে রাস্তার কাজটা বন্ধ করে দেবেন। ওয়ার্ক অর্ডার ছাড়া কীভাবে কাজ হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনাদের ভয়ে ইঞ্জিনিয়াররা একথা বলেছেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ এজিএম সেলিম সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, জলাশয় সংরক্ষণ আইন- ২০০০ অনুসারে চট্টগ্রাম শহরে কোনো পুকুর, দীঘি ভরাট করা নিষিদ্ধ। রাণীর দীঘিতে রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে আমার জানা মতে সিডিএ থেকে কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর উপ পরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিন সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, রানীর দীঘিতে রাচ্চা নির্মাণের বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে সিটি কর্পোরেশন কোনো অনুমতি নেয় নি। তাদেরকে মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে চিঠিও দেয়া হয়েছে। তাও কাজ বন্ধ না করায় আমরা সংশ্লিষ্ট থানায় বিষয়টি জানিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছি। এবিষয়ে দীঘির মালিক কাজী জাকির হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মালিকানাধীন দোস্ত বিল্ডিং এর কেয়ারটেকার মোহাম্মদ মালেক বলেন, সাহেবের মা অসুস্থ। তাকে নিয়ে সাহেব দুই মাস ধরে সিঙ্গাপুরে আছেন। এক সপ্তাহ পরে হয়তো তিনি দেশে ফিরতে পারেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এবিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি আগামীকালই (রোববার) খবর নেব। আইন অনুসারে জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন